Friday, May 1, 2020

ছোট গল্প - সে কি জীবিত না মৃত? – মার্ক টোয়েন - Is He Living or Is He Dead? By Mark Twain - Bangla Translation

ছোট গল্প - সে কি জীবিত না মৃত? – মার্ক টোয়েন - Is He Living or Is He Dead?  By Mark Twain - Bangla Translation 
Is He Living or Is He Dead?By Mark Twain - Bangla Translation 

সে কি জীবিত না মৃত মার্ক টোয়েন
১৮৯২ সালের মার্চ মাসটা আমি রিভিয়েরা- মেন্টোন (Mentone, in the Riviera) - কাটাচ্ছিলাম। এখান থেকে কয়েক মাইল দূরে মন্টিকার্লো এবং নাইস- সাধারণের জন্য যেসব সুখ-সুবিধা আছে, ব্যক্তিগতভাবে সেই সব সুখ-সুবিধা অবসর-যাপনের এই জায়গাটাতেও পাওয়া যায়। তার অর্থ, এখানে আছে প্রচুর রোদ, স্বাস্থ্যপ্রদ হাওয়া, আর উজ্জ্বল নীল সমুদ্র ; অথচ মানুষের হৈ-হট্টগোল নানারকম পোশাকের পারিপাট্য এখানে চোখে পড়ে না। মেন্টোন শান্ত, সরল বিশ্রামস্থল; ধনী জাকজমকবিলাসীরা সেখানে যায় না। আমি বলতে চাই, ধনী লোকেরা সাধারণত সেখানে যায় না। মাঝে-সাঝে এক-আধজন ধনী মানুষ এসে পড়ে। সম্প্রতি সেই রকম একজনের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছে। তার পরিচয় কিছুটা গোপন রাখবার জন্য তাকে আমি স্মিথ বলে ডাকব।
একদিন হোটেল দ্য আংলে- দ্বিতীয় প্রাতরাশের সময় সে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল :
জলদি! যে লোকটি দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে তাকে লক্ষ করুন। তার সব বিবরণ টুকে নিন। 
কেন?’
লোকটি কে জানেন?’ 
হ্যা। আপনি আসবার আগে থেকেই তিনি এখানে আছেন। লোকে বলে, তিনি লায়ন্স থেকে আগত একজন বৃদ্ধ, অবসরপ্রাপ্ত, খুব ধনী, রেশমিবস্ত্র-প্রস্তুতকারক। আমার ধারণা, লোকটি এই পৃথিবীতে একেবারে একা, কারণ সবসময় তাকে বিষন্ন স্বপ্নদর্শী বলে মনে হয়, কারও সঙ্গে কথা বলেন না। তার নাম বিয়োফিল ম্যাগনান। 
ভেবেছিলাম, এবার স্মিথ খুলে বলবে মঁসিয়ে ম্যাগনান-এর প্রতি তার এই অতি আগ্রহের কারণ কী; কিন্তু তার পরিবর্তে সে যেন একটা দিবাস্বপ্নের মধ্যে ডুবে গেল এবং কয়েক মিনিটের জন্য আমার কাছ থেকে এবং বাকি পৃথিবীর কাছ থেকেও হারিয়ে গেল। মাঝে মাঝে চিন্তার সুবিধা হবে বলে চকচকে সাদা চুলের মধ্যে আঙুল বুলোতে লাগল, আর এদিকে প্রাতরাশ ক্রমেই ঠাণ্ডা হতে লাগল। অবশেষে বলল :
না, একেবারেই হারিয়ে গেছে; কিছুতেই মনে করতে পারছি না। 
কী মনে করতে পারছেন না?’
হ্যান্স এন্ডারসন-এর (Hans Andersen's) একটি ছোট্ট সুন্দর গল্প। একেবারেই ভুলে মেরে দিয়েছি। কিছুটা অংশ এই রকম : একটি শিশুর ছিল খাচায় বন্দি একটা পাখি। পাখিটাকে সে ভালোবাসে, কিন্তু কিছু না-ভেবেচিন্তেই তাকে অবহেলা করে। পাখিটা গান গায়, কিন্তু কেউ তা শোনে না। কেউ সেদিকে মন দেয় না; যথাসময়ে পাখিটা ক্ষুধায় তৃষ্ণায় কাতর হয়, তার গান বিষন্ন দুর্বল হতে হতে এক সময় থেমে যায়পাখিটা মারা যায়। শিশুটি আসে, দুঃখে তার মন কাতর হয়; তারপর চোখের জলে শোক করতে করতে সে তার সঙ্গীদের ডেকে এনে যথাযোগ্য জাকজমক দুঃখের সঙ্গে পাখিটাকে কবর দেয়। বেচারিরা জানতেও পারে না যে জীবিতকালে তাদের বাঁচিয়ে রাখতে আয়েসে-আরামে রাখতে চেষ্টা না-করে কবিদের না-খাইয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে তারপর তাদের সৎকারে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজে যথেষ্ট টাকা-পয়সা খরচ করবার এই অপকর্মটি শুধু শিশুরাই যে করে তা নয়। এখন—’
সেদিন এই পর্যন্ত কথা হয়েই আলাপ শেষ হল। সন্ধে দশটা নাগাদ স্মিথের সঙ্গে দেখা হতেই সে আমাকে তার ঘরে নিয়ে গেল একসঙ্গে গরম স্কচ খাবে বলে! ঘরটা খুব আরামদায়ক। ভালো চেয়ার, উজ্জ্বল বাতি, ভালো অলিভ কাঠের খোলা আগুন। তার ওপর সোনায় সোহাগার মতো বাইরে থেকে ভেসে আসছে সমুদ্রের বিক্ষিপ্ত তরঙ্গগর্জন। দ্বিতীয় দফা স্কচ অনেকরকম অলস গুলতানির পরে স্মিথ বলল : আমার ধারণা এতক্ষণে আমরা দুজনই প্রস্তুত আমি একটা আশ্চর্য ইতিহাস বলতে, আর আপনি সে ইতিহাস শুনতে। অনেক বছর ধরে কথাটা গোপন রয়েছে-আমার অপর তিনজনের গোপন একটা কথা : এবার আমি সে গোপনিয়তা ভাঙতে চলেছি। আপনি আরাম বোধ করছেন তো?’
বলে যান। 
সে যা বলে গেল এই তার মর্মার্থ :
অনেক বছর আগে আমি ছিলাম একজন তরুণ শিল্পীখুবই তরুণএখানে কিছু ছবি আঁকি, ওখানে কিছু ছবি আঁকি, এইভাবে ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে ঘুরতে ঘুরতে আরও দুজন ফরাসি তরুণের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়ে গেল; তারাও আমার মতো একই কাজে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমরা ছিলাম যেমন সুখী তেমনই গরিব, অথবা যেমন গরিব তেমনই সুখী। ক্লদ ফেরে কার্ল বুলাজার (Claude Frere and Carl Boulanger)-এই হল ছেলে দুটির নাম; বড়ই ভালো ছেলে দুটি; দারিদ্র্যকে দেখে মনের সুখে হাসতে পারে; সুখে-দুঃখে একই মনোভাব বজায় রাখতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ব্রোতে গ্রামে পৌছে আমরা গভীর গাড্ডায় পড়ে গেলাম, আর সেখানেই আমাদেরই মতো গরিব আর একটি শিল্পী আক্ষরিক অর্থেই আমাদের জনকে অনাহারের হাত থেকে বাঁচতে সাহায্য করলতার নাম ফ্রাঁসোয়া মিলেৎ (Francois Mille) 
কী! বিখ্যাত ফ্রাঁসোয়া মিলেৎ?’ 
বিখ্যাত? তখন সে আমাদের চাইতে বেশি বিখ্যাত ছিল না। এমনকি নিজের গ্রামেও তার কোনো খ্যাতি ছিল না। এতই গরিব ছিল যে শালগম ছাড়া আর কিছুই আমাদের খাওয়াতে পারেনি সে; এমন কি মাঝে মাঝে শালগমেরও অভাব ঘটত তার। আমরা চারজন হয়ে উঠলাম তার ঘনিষ্ঠ আর অত্যুৎসাহী বন্ধু। একসঙ্গে সাধ্যমতো ছবি আঁকতে লাগলাম আমরা; ছবির স্তুপের পর স্তুপ জমতে লাগল; কদাচিৎ তার এক-আধখানা বিক্রি হত। তবু একসঙ্গে বেশ কাটছিল, কিন্তু মাঝে মাঝে দুর্দশা একেবারে চরমে উঠত।
দুই বৎসরাধিক কাল এইভাবে চলল। অবশেষে একদিন ক্লদ বলল : দেখো ভাইরা, এতদিনে আমরা শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছেছি। বুঝতে পারছ ব্যাপারটা? —একেবারে শেষপ্রান্তে। সকলেই আমাদেরকে আঘাত করতে উদ্যত আমাদের বিরুদ্ধে সকলে একজোট। সারা গ্রাম ঘুরে এসেছি; যা বললাম তাই ঠিক। পাই-পয়সা পর্যন্ত সব ধার মিটিয়ে না-দিলে তারা আমাদের আর এক সেন্টিমও ধার দেবে না। 
আমরা বড়ই ঘাবড়ে গেলাম। প্রত্যেকের মুখই হতাশায় সাদা হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম, আমাদের অবস্থা বড়ই সঙ্গীন। অনেকক্ষণ সকলেই চুপচাপ। অবশেষে মিলেৎ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল :
আমার তো মাথায় কিছুই আসছে না--কিছু না। তোমরা কিছু বাতলাও-না বাছাধনেরা। 
কোনো সাড়া নেই; অবশ্য বিষন্ন নীরবতাকে যদি সাড়া বলা যায় তো আলাদা কথা।
কার্ল উঠে দাঁড়াল; কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক পায়চারি করল; তারপর বলল : বড়ই লজ্জার কথা! এই ক্যানভ্যাসগুলোর দিকে তাকাও; স্তুপের পর স্থূপ এমন সব ভালো ছবি ইওরোপের যে কেউ নিশ্চয়ই আঁকতে পারবে না। হ্যা, ভ্রমণে রয়েছে এমন অনেক অপরিচিত লোকই -কথা বলেছে। 
কিন্তু একটা ছবিও তো কেউ কেনেনি। 
মিলেৎ বললঃ তা না কিনুক, একথা তারা বলেছে। আর কথাটা সত্যিও। যে তোমার ফেরেশতা, ওটার দিকে তাকাও। কেউ কি বলবে যে—’
আঃ, কার্লআমার ফেরেশতা’-এর দাম উঠেছিল মাত্র পাঁচ ফ্রা।
কখন?’
কে দিতে চেয়েছিল?’
কোথায় সে?’
দামটা নাওনি কেন?’
থামসকলে একসঙ্গে কথা বল না। ভেবেছিলাম লোকটা আরও বেশি দেবে। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস ছিলতাকে দেখেই কথাটা বিশ্বাস হয়েছিলতাই আমি আট ফ্রা চেয়েছিলাম।
তারপর?’
সে বলল পরে আসবে। 
আমি জানি পাঁচ ফ্রাতে তক্ষুনি ওটা না-বিক্রি করা আমার ভুল হয়েছিল। আর আমিও কেমন যেন বোকা ছিলাম। বাপুরা, আমি তো ভালো বুঝেই দামটা একটু বেশি চেয়েছিলাম। 
নিশ্চয়, নিশ্চয়, আমরাও তা জানি; মনটা তো তোমার ভালোই। কিন্তু দেখো, আবার যেন বোকামি কর না।  আমি? এখন যদি কেউ এসে এটার জন্য একটা বাধাকপিও দিতে চায় তা- দিয়ে দেব। 
একটা বাঁধাকপি! আঃ ওই নামটা আর কর না তোআবার জিভে জল আসছে। আরও সামান্য কোনো জিনিসের কথা বল।
কার্ল বলল, ‘বাছারা, এই ছবিগুলোতে কি গুণের কমতি আছে? আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। 
না
এগুলো কি খুব উঁচুদরের ছবি নয়? -প্রশ্নের উত্তর দাও। 
এতই বড় আর উঁচুদরের জিনিস এগুলো যে, কোনো বিখ্যাত লোকের নাম যদি আমরা এদের সঙ্গে জুড়ে দিতে পারি তাহলে প্রচণ্ড দামে এগুলি বিক্রি হয়ে যাবে, নয় কি?’ 
নিশ্চয়, এতে কোনো সন্দেহই নেই। না, ঠাট্টা নয়, কথাটা সত্যি কি না?’
নিশ্চয়ই, আমরাও ঠাট্টা করছি না। কিন্তু তাতে হলটা কী? তাতে আমাদের কী আসে যায়?’
আসে-যায় কমরেডগণএইসব ছবির সঙ্গে আমরা একটি বিখ্যাত নাম জুড়ে দিলে অনেক কিছুই এসে যায়। 
আমাদের আলোচনা বন্ধ হয়ে গেল। সকলেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কার্ল-এর দিকে তাকাল।
এটা আবার কী রকমের ধাঁধা? একটা বিখ্যাত নাম ধার পাওয়া যাবে কোথায়? আর সেটা ধার করবেই-বা কে?’
কার্ল বসে পড়ে বলল : এবার আমি একটা খুব গুরুতর প্রস্তাব করতে যাচ্ছি। আমি মনে করি, ভিক্ষাবৃত্তির হাত থেকে আমাদের বাঁচবার এটাই একমাত্র উপায়। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের চেষ্টা সফল হবেই। মানবেতিহাসের বহুসংখ্যক দীর্ঘপ্রতিষ্ঠিত ঘটনার ওপরেই আমার এই মতামত প্রতিষ্ঠিত। আমি বিশ্বাস করি, এই পরিকল্পনা আমাদের সকলকেই ধনী করে তুলবে। 
ধনী! তোমার মাথা খারাপ হয়েছে নাকি?’
আদৌ না। 
হ্যা, হয়েছে। তোমার বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পেয়েছে! ধনী হতে হলে এসব একেকটা ছবির দাম কত হওয়া উচিত বল তো?’
একলাখ ফ্রা এবং আমরা তা পাবও।
সত্যি ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
হ্যা, তাই কার্ল, দুঃখ-কষ্ট সইতে না পেরে বোধ হয়...
কার্ল, একটা বড়ি খেয়ে সোজা গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়।
তার আগে ওর মাথায় একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে দাওতার পরে—’
না, ব্যান্ডেজ বাধা উচিত ওর পায়ে; আমি লক্ষ করেছি--বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই ওর মাথার গোলমাল চলছে। অত্যন্ত কঠোর সুরে মিলেৎ বলে উঠল, ‘চুপ কর! বেচারাকে তার বক্তব্য বলতে দাও। বল হে বাপু, তোমার পরিকল্পনা বুঝিয়ে বল কার্ল। ব্যাপারটা কী?’
আচ্ছা, তাহলে প্রথমেই ভূমিকা স্বরূপ ইতিহাসের একটা সত্যকে তোমরা লক্ষ কর : অনেক মহৎ শিল্পীর সৃষ্টিকর্মই তার অনাহারে মৃত্যু ঘটবার আগে কখনও স্বীকৃতি লাভ করেনি। এটা এত বারবার ঘটেছে যে এর ওপর ভিত্তি করে আমি একটা সাধারণ নিয়ম প্রতিষ্ঠা করতে চাইছি। নিয়মটা হল : প্রতিটি অজ্ঞাত অবহেলিত মহৎ শিল্পীর কীর্তিই একদিন অবশ্য স্বীকৃতি পাবে এবং তাঁর মৃত্যুর পর ছবির দাম চড়বে অনেক উঁচুতে। আমার পরিকল্পনা হল : আমরা ভাগ্যপরীক্ষা করবআমাদের একজনকে অবশ্যই মরতে হবে।
কথাগুলো এতই শান্ত অপ্রত্যাশিতভাবে বলা হল যে আমরা খুশিতে লাফিয়ে উঠতেও ভুলে গেলাম। তারপর শুরু হল সমস্বরে নানা রকমের উপদেশ বর্ষণ-ডাক্তারি উপদেশকার্লের মাথার ব্যামোকে কী করে সারাতে হবে তার বিভিন্ন পরামর্শ। কিন্তু কার্ল সেই হৈ চৈ শান্ত না-হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করল, তারপর তার পরিকল্পনার কথা বলে যেতে লাগল। হ্যাঁ, অন্য সবাইকে এবং নিজেকে বাঁচাতে আমাদের একজনকে মরতেই হবে। নিয়ে আমাদের ভাগ্য-পরীক্ষা করতে হবে। যার নাম উঠবে সেই হবে বিখ্যাত শিল্পী এবং ধনী, আর আমরা অন্য তিনজন হব কেবলমাত্র ধনী। চুপ কর, এখন চুপ কর আমি যা বলছি, সব জেনে-বুঝেই বলছি। যাকে মরতে হবে আগামী তিনমাস ধরে সে সর্বশক্তি নিয়োগ করে ছবি এঁকে যাবে, যতদূর সম্ভব ছবির পুঁজি বাড়াবেশুধু ছবিই নয়, রেখাচিত্র, স্টাডি, স্টাডির অংশ, প্রত্যেকটির ওপর ডজনখানেক ব্রাশের টানসেগুলোকে অবশ্যই অর্থহীন হতে হবে, কিন্তু ছবিতে স্বাক্ষরিত তার নামের একটা বৈশিষ্ট্য তাতে থাকবে; দিনে এরকম অন্তত পঞ্চাশটা আঁকতে হবে তাকে। প্রত্যেকটাতেই তার সহজবোধ্য কিছু বৈশিষ্ট্য বা রীতি-পদ্ধতির প্রকাশ থাকবে-তোমরা তো জান সে সবেরই বিক্রি হয় সবচেয়ে বেশি-কোনো মহান শিল্পীর মৃত্যুর পর সেগুলোই তো অবিশ্বাস্য রকমের মোটা দামে বিক্রি হয়ে পৃথিবীর সব যাদুঘরে সংগৃহীত হয়ে থাকে। সেরকম টনটন শিল্পকর্ম আমাদের হাতে মজুত রাখতে হবে। ইতিমধ্যে আমরা বাকি -জন মুমূর্ষকে সেবা করতে, প্যারিসে অন্য জায়গায় ছবির ক্রেতাদের সঙ্গে বন্দোবস্ত করার কাজে ব্যস্ত থাকবঅর্থাৎ আসন্ন ঘটনার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকব; তারপর সবকিছু ঠিক ঠিক মতো ব্যবস্থা হয়ে গেলেই মৃত্যুর খবরটা সর্বত্র ছড়িয়ে দেব এবং ঘটা করে একটা শোকযাত্রার আয়োজন করব। কী, এবার ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছ তো সবাই ভালোভাবে?
নানা; অন্তত সবটা
সবটা বুঝতে পারনি, এই তো? আসলে আমাদের কেউ মারা যাবে না, শুধু নাম পাল্টে উধাও হয়ে যাবে; একটা নকল শবাধারকে আমরা কবর দেব, তার জন্য কাঁদব, আর সমস্ত জগৎ আমাদের সহায় হবে। আর আমি তাকে কথা শেষ করতেও দেওয়া হল না। সকলেই সমর্থনসূচক উল্লাসধ্বনিতে ফেটে পড়ল; লাফিয়ে উঠে ঘরময় নেচে-কঁদে একে অপরের গলা জড়িয়ে ধরে কৃতজ্ঞতা আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই মহান পরিকল্পনা নিয়ে আমরা কথা বললাম; এমনকি ক্ষুধা-তৃষ্ণা পর্যন্ত ভুলে গেলাম। শেষ পর্যন্ত সবকিছুরই সন্তোষজনক ব্যবস্থা হয়ে যাবার পর ভাগ্যপরীক্ষা করা হল এবং তাতে মিলেৎ নির্বাচিত হলঅর্থাৎ তথাকথিত মৃত্যুর জন্য নির্বাচিত হল। পরদিন খুব সকালে প্রাতরাশ সেরেই আমরা তিনজন বেরিয়ে পড়লাম---অবশ্যই পায়ে হেঁটে। প্রত্যেকের সঙ্গে মিলেৎ-এর ডজনখানেক ছবি-উদ্দেশ্য সেগুলোর বিক্রির ব্যবস্থা করা। কার্ল-এর লক্ষ্য প্যারিসআসন্ন মহাদিবস উপলক্ষে মিলেৎ-এর খ্যাতিকে গড়ে তোলার কাজ সে শুরু করবে সেখানে। ক্লদ আমি আলাদাভাবে ফ্রান্সের দূর দূর অঞ্চলকে বেছে নিলাম। কত সহজে আরামে আমরা যে আমাদের উদ্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে গেলাম সে-কথা শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। কাজ শুরু করবার আগে দু-দিন একটানা হাঁটলাম আমরা। তারপর একটা বড় শহরের উপকণ্ঠস্থ একটা ভিলার স্কেচ করতে শুরু করে দিলামদোতলার বারান্দায় বাড়ির মালিকাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম, তাই। ব্যাপারটা দেখতে পেয়ে মালিক নেমে এলেনআমি জানতাম তিনি আসবেন। তাঁর আগ্রহকে বাড়িয়ে তুলবার জন্য আমি দ্রুত কাজ করে যেতে লাগলাম। আমার ছবি আকার দক্ষতা দেখে মাঝে মাঝে তার মুখ থেকে প্রশংসার বাণী বেরিয়ে আসতে লাগল। ক্রমে একান্ত উৎসাহের সঙ্গে একসময় তিনি বলেই বসলেন যে, আমি সন্দেহাতীতভাবে একজন মহৎ শিল্পী। ব্রাশটা রেখে দিয়ে বোলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে মিলেৎ-এর আঁকা একখানা ছবি বের করে এক কোণে লেখা নামটার দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম, সগর্বে বললাম :
-স্বাক্ষরটা আপনি নিশ্চয় দেখেছেন? দেখুন, তার কাছেই আমার শিক্ষা-দীক্ষা! কাজেই আমার আঁকায় যে অল্পবিস্তর কিছু পারদর্শিতার ছাপ থাকবে তাতে আর সন্দেহ কী!
লোকটি অপরাধীর মতো বিব্রত মুখে আমার দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। আমি দুঃখের সঙ্গে বললাম :
আপনি ফ্রাসোয়া মিলেৎ -এর স্বাক্ষর চেনেন না--একথা নিশ্চয়ই আমাকে বিশ্বেস করতে বলবেন না!  স্বাক্ষরটা তিনি সত্যি চিনতেন না। কিন্তু এমন সকৃতজ্ঞ লোক বুঝি আর হয় না। তিনি বলে উঠলেন : না, না! আরে, এটা যে দেখছি সত্যি সত্যি মিলেৎ-এর স্বাক্ষর। জানি না এতক্ষণ কোন কথা ভাবছিলাম। -স্বাক্ষর তো আমি অনেকদিন থেকেই চিনি।
তারপরেই তিনি ছবিটা কিনতে চাইলেন; কিন্তু আমি বললাম, ধনী না-হলেও অতটা গরিব আমি নই। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত আটশ ফ্রা দামে ছবিটা তার কাছে বিক্রি করলাম।
হ্যাঁ, মিলেৎ হয়তো মাংসের চপের বদলেই ওটা বেচে দিত। হ্যাঁ, ছোট ছবিটার জন্য আমি পেলাম আটশ ফ্রা। আহা, আজ যদি আশি হাজার দিয়েও ছবিটা ফেরত পেতাম। কিন্তু সে দিন চলে গেছে, লোকটির বাড়ির একটা সুন্দর ছবি এঁকে দশ ফ্রা দামে সেটা তাকে দিতে চাইলাম, কিন্তু যেহেতু আমি এত বড় একজন গুরু ছাত্র সেজন্য অত অল্প দামে তিনি এটা নিতে রাজি হলেন না; ফলে ওটার জন্য পেলাম একশ ফ্রা। সঙ্গে সঙ্গে আটশ মিলেৎ-কে পাঠিয়ে দিয়ে পরদিন আবার যাত্রা শুরু করলাম। 
কিন্তু এবার আর পায়ে হেঁটে নয়। গাড়িতে চেপে। সেই থেকে গাড়ি চেপেই চলাফেরা করে আসছি। প্রতিদিন একখানি মাত্র ছবি বিক্রি করি; কখনও দুখানা বিক্রির চেষ্টাও করি না। ক্রেতাকে সবসময়ই বলি : ফ্রাঁসোয়া মিলেৎ-এর ছবি বিক্রি করাই তো আমার পক্ষে বোকামি, কারণ মানুষটি আর তিনমাসও বাঁচবেন না, এবং একবার তিনি মারা গেলে -ছবিটা তো এর হাজার গুণ টাকা দিলেও মিলবে না।এই ছোট ঘটনাকে যতদূর সম্ভব প্রচার করে বেড়াতে লাগলাম আমরা এবং এইভাবে সেই পরম লগ্নের জন্য জগৎবাসীকে প্রস্তুত করে তুললাম। ছবিগুলো বিক্রি করবার সব কৃতিত্বই আমার-কারণ এই ফন্দিটা আমিই বের করেছিলাম। শেষের যে-রাতে আমরা পরিকল্পনা মতো অভিযানে নামতে যাচ্ছি সেই সময়ই প্রস্তাবটা আমি সকলের সামনে রাখি এবং আমরা তিনজনই একমত হই যে অন্য কোনো পন্থা অবলম্বন করবার আগে এই ব্যবস্থাটাকে ভালো রকম পরীক্ষা করে দেখা উচিত। কিন্তু তিনজনের বেলায়ই ফন্দিটা খুব কাজে লেগে যায়। আমাকে পায়ে হাঁটতে হয়েছে মাত্র দু-দিন; ক্লদও হেঁটেছে মাত্র দু-দিন। বাড়ির এত কাছে মিলেৎকে খ্যাতিমান করে তোলার ব্যাপারে আমাদের দুজনের মনেই যথেষ্ট ভয় ছিল; কিন্তু কার্ল হেঁটেছিল মাত্র অর্ধেক দিনআর তারপর থেকেই সে চলাফেরা করেছে ডিউকের মতো।
মাঝে মাঝেই কোনো গ্রাম্য সংবাদপত্রের সম্পাদকের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত; তার সহায়তায় কাগজে একটা সংবাদও ছাপার ব্যবস্থা করে ফেলতাম আমরা। সে-সংবাদে একজন নতুন শিল্পীকে আবিষ্কারের কথা থাকত না, থাকত ফ্রাঁসোয়া মিলেৎ-এর সর্বজন পরিচিতির ঘোষণা। কোনো সংবাদেই তার কোনো প্রশংসার কথা লেখা হত না, লেখা ইত এই শিল্পগুরু স্বাস্থ্য সম্পর্কে মাত্র একটি কথা-কখনও আশার কথা, কখনও নৈরাশ্যের কিন্তু সবসময়ই তার সঙ্গে মেশানো থাকত চরম অবস্থার জন্য আতঙ্কের কথা। সংবাদপত্রের সেই অনুচ্ছেদগুলোকে দাগ দিয়ে আমরা পাঠিয়ে দিতাম মিলেৎ-এর ছবি যারা আমাদের কাছ থেকে কিনেছে তাদের ঠিকানায়।
কার্ল অচিরেই প্যারিসে উপস্থিত হয়ে বেশ ভালো হাতে কাজ গুছিয়ে ফেলেছিল। সংবাদদাতাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে মিলেৎ-এর স্বাস্থ্যের সংবাদ ইংল্যান্ড, ইওরোপ, আমেরিকা পৃথিবীর সর্বত্র প্রচারের ব্যবস্থা করে ফেলল। কাজের শুরু হবার -সপ্তাহের মধ্যেই আমরা তিনজন প্যারিসে মিলিত হয়ে কাজে বিরতি টানলাম এবং মিলেৎ-এর কাছে নতুন করে ছবি পাঠাতে নির্দেশ দিলাম। বাজার বেশ চড়েছে; একেবারে সরগরম অবস্থা। তাই ভাবলাম, আর অপেক্ষা না-করে অবিলম্বে মোক্ষম আঘাতটা হানা দরকার। তাই মিলেৎকে লিখে দেওয়া হল, সে যেন শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুকিয়ে হাড়সর্বস্ব হয়ে যায়, কারণ আমরা চাই সে দশ দিনের মধেই মারা যাক।।
টাকাকড়ি গুণে দেখলাম, তিনজনে মিলে আশিখানি ছোট ছবি স্টাডি বিক্রি করেছি এবং তার জন্য পেয়েছি ঊনসত্তর হাজার ফ্রা। সর্বশেষ ছবিখানি বিক্রি করেছে কার্ল এবং মোক্ষম দাও মেরেছে। ফেরেশতারছবিটা সে বেচেছে বাইশ ফ্রা দামে।
মিলেৎ-এর বাজার-দর তখন কতখানি উঠেছে ভেবে দেখুনঅবশ্য তখনও আমরা বুঝতে পারিনি যে এমন একটা দিন আসছে যখন ছবিটা পাবার জন্য সারা ফ্রান্সে লড়াই লেগে যাবে এবং কোনো অপরিচিত লোক নগদ পঞ্চাশ হাজার দিয়ে ওটা কিনে নেবে।
কাজকর্ম গুটিয়ে ফেলবার আগের রাতে আমরা নৈশভোজন সমাধা করলাম। পরদিন ক্লদ আমি জিনিসপত্র বেঁধেছেদে শেষের কটা দিন মিলেৎ-এর সেবা শুশ্রষার জন্য চলে গেলাম। অহেতক কৌতুহলী লোকজনদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে প্যারিসে কার্ল-এর কাছে দৈনিক বুলেটিন পাঠাতে লাগলাম, যাতে সে বিভিন্ন মহাদেশের সংবাদপত্রের মারফত অপেক্ষমাণ পৃথিবীর কাছে সংবাদ নিয়মিত পৌছে দেওয়ার কাজ চালিয়ে যেতে পারে। অবশেষে এল শেষের সেই দুঃখের দিনটি সৎকার-অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার দিন সৎকার অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য কার্লও যথাসময়ে এসে হাজির হল। ফ্রাঁসোয়া মিলেৎ-এর সেই বিরাট সৎকার অনুষ্ঠানের কথা নিশ্চয় আপনার মনে আছে।
পৃথিবীজুড়ে সে কী হৈ চৈ! দুই পৃথিবীর সব বড় বড় লোক এসে সেই শেষকৃত্যে তাদের শোক নিবেদন করেছিল। আমরা চার বন্ধুই শবাধার বয়ে নিয়ে গেলাম; অন্য কাউকে হাত লাগাতে দিলাম না। সেটা খুবই সতর্কতার সঙ্গে করতে হল। কারণ শবাধারের ভেতরে একটা মোমের মূর্তি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কাজেই অন্য যে-কোনো শবাধারবাহকই এত কম ওজনের শবাধার দেখলে সন্দেহ প্রকাশ করে বসত। হ্যা আমরা সেই পুরনো চারজনইযারা একদা দুঃখের দিনে স্বেচ্ছায় একসঙ্গে সে দুঃখকে ভাগ করে ভোগ করেছি, আর আজ যে দুঃখ চিরদিনের মতো আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেসেই পুরনো চারজনই শবাধারটা বহন----
কোন চারজন।
আমরা চারজনকারণ মিলেৎ নিজেও শবাধার বহন করেছিল। বুঝতেই পারছেন, সে ছিল ছদ্মবেশে একজন দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের পরিচয়ে। 
আশ্চর্য! 
আশ্চর্য হলেও সত্য। আচ্ছা, তারপর থেকেই ছবির দাম কীভাবে বাড়তে লাগল সে আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে। আর টাকা? অত টাকা নিয়ে কী করব তাই ভেবে পেতাম না।
আজ প্যারিসে এক ভদ্রলোকের নিজেরই আছে সত্তরখানা মিলেৎ-এর আঁকা ছবি। সে আমাদের দিয়েছিল কুড়ি লক্ষ ফ্রা। আর যে টা সপ্তাহ, আমরা পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম তখন মিলে ঘরে বসে যে ঝুড়ি-কুড়ি স্কেচ স্টাডি করেছিল, আজকাল আমরা সেগুলোকে কী দামে যে বিক্রি করিঅবশ্য যখনই কোনো একটাকে আমরা হাতছাড়া করতে রাজি হইসেই কথা শুনলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন।
এক আশ্চর্য ইতিহাসএকেবারেই আশ্চর্য!
হ্যা, তা বলতে পারেন।
আর মিলেৎ-এর কী হল?’ 
কথাটা গোপন রাখতে পারবেন তো?’
তা পারব।
আজ খাবার ঘরে যে লোকটির প্রতি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম তার কথা মনে আছে? সেই হল ফ্রাঁসোয়া মিলেৎ। 
মহান---
স্কট! হ্যাঁ। এই একটি ক্ষেত্রেই কেবল জনসাধারণ একটি প্রতিভাকে না-খেয়ে মরতে দেয়নি, আর যে পুরস্কার ছিল তার প্রাপ্য, তাই দিয়ে ভরিয়েছে অন্যের পকেট। অন্তত এই গায়ক পাখিটির বেলায় তার মধুর সঙ্গীতে কান না দিয়ে তার মৃত্যুর পর এক বিরাট সৎকার-অনুষ্ঠানে জাঁকজমক করে তার দাম দেওয়া হয়নি। আর সে-ব্যবস্থাটা আমরাই করেছিলাম।

No comments:

Post a Comment

Popular Posts