মজার গল্প, উপন্যাস, গোয়েন্দা কাহিনী, ছোট গল্প, শিক্ষামূলক ঘটনা, মজার মজার কৌতুক, অনুবাদ গল্প, বই রিভিউ, বই ডাউনলোড, দুঃসাহসিক অভিযান, অতিপ্রাকৃত ঘটনা, রুপকথা, মিনি গল্প, রহস্য গল্প, লোমহর্ষক গল্প, লোককাহিনী, উপকথা, স্মৃতিকথা, রম্য গল্প, জীবনের গল্প, শিকারের গল্প, ঐতিহাসিক গল্প, অনুপ্রেরণামূলক গল্প, কাহিনী সংক্ষেপ।

Sunday, September 6, 2020

ছোট গল্প – আ ওয়াচার বাই দ্যা ডেড – অ্যামব্রোজ বিয়ার্স - বাংলা অনুবাদ - Short Story - A Watcher By The Dead - Ambrose Bierce – Bengali Translation

 

ছোট গল্প  আ ওয়াচার বাই দ্যা ডেড  অ্যামব্রোজ বিয়ার্স - বাংলা অনুবাদ - Short Story - A Watcher By The Dead - Ambrose Bierce – Bengali Translation

ছোট গল্প আ ওয়াচার বাই দ্যা ডেড অ্যামব্রোজ বিয়ার্স - বাংলা অনুবাদ - Short Story - A Watcher By The Dead - Ambrose Bierce Bengali Translation

 

সানফ্রান্সিসকোর নর্থ বীচ অঞ্চলের পরিত্যক্ত এক বাড়ির ওপরতলার একটা ঘরে চাদরে ঢেকে শোয়ানো আছে একজন মানুষের লাশ। রাত প্রায় নটা বাজে, ঘরটায় ক্ষীণ আলো ছড়াচ্ছে একটা মাত্র মোমবাতি। লাশ রাখা ঘরে সাধারণত প্রচুর আলো আর বাতাসের ব্যবস্থা রাখা হয়, কিন্তু দুটো জানালাই বন্ধ আর খড়খড়ি নামানো থাকায় এই ঘরের আবহাওয়া গরম। ঘরটায় তিনটে মাত্র আসবাব-একটা আর্মচেয়ার, ছোট্ট একটা রীডিং স্ট্যাণ্ড, যার ওপরে মোমবাতিটা রাখা আছে, আর লম্বা একটা কিচেন-টেবিল, যার ওপরে শোয়ানো আছে লাশটা। যে-কেউ এখানে থাকলে লক্ষ করত যে আসবাব তিনটে আর লাশটাকে এখানে খুব বেশি আগে আনা হয়নি, কারণ, ওই কটা জিনিস ছাড়া সারা ঘরে ধুলোর পুরু স্তর, দেয়ালের কোণ থেকে ঝুলছে মাকড়সার জাল। ঘরটা বাড়ির পিছনের দিকে, ওটার পিছন থেকেই উঠে গেছে খাড়া পাথুরে দেয়াল। বাড়িটাকে তৈরি করা হয়েছে পাহাড়ের গায়ে।

পাশের কোনও গির্জার ঘড়িতে ঢং ঢং করে নটা বাজল। এমনই অলস, গতানুগতিক সেই শব্দ শুনে যে কারও এ-কথা মনে হওয়া বিচিত্র নয় যে ঘণ্টা পেটানোর ঝামেলা ঘড়িটা না পোহালেও পারে। ঘরটার একমাত্র দরজা খুলে প্রবেশ করল একজন লোক, এগিয়ে গেল লাশটার দিকে। পেছনে আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল দরজা, বাইরে থেকে ভেসে এল তালা লাগানোর শব্দ। এরপর প্যাসেজ ধরে ফিরে যাওয়া পদশব্দে মনে হলো, লোকটা যেন বন্দি। টেবিলের কাছে গিয়ে লাশটাকে দেখল সে কিছুক্ষণ, তারপর কাঁধ ঝাকিয়ে জানালার কাছে গিয়ে তুলে দিল খড়খড়ি। বাইরে নেমে এসেছে গাঢ় অন্ধকার, জানালার কাচগুলো ঢাকা পড়ে গেছে ধুলোর নীচে। কাচ পরিষ্কার করতে সে দেখল, লোহার গরাদ দিয়ে জানালাটা বন্ধ করা। অন্য জানালাটা পরীক্ষা করল সে। একই অবস্থা। ঘর পর্যবেক্ষণ শেষ করে, আর্মচেয়ারে গিয়ে বসে, পকেট থেকে একটা বই বের করল সে, তারপর মোমবাতিসহ রীডিং-স্ট্যাণ্ডটা টেনে নিয়ে পড়তে শুরু করল। লোকটার বয়েস ত্রিশের বেশি নয়, গায়ের রঙ গাঢ়, নিখুঁতভাবে শেভ করা মুখ, মাথায় বাদামী চুল। তার মুখের গড়ন পাতলা, খাড়া নাক, চওড়া কপাল, শক্ত চোয়ালে জেদের চিহ্ন। ধূসর, অবিচল চোখ, নির্দিষ্ট কাজ ছাড়া সেগুলো বেশি নড়াচড়া করে না। এই মুহূর্তে তার দৃষ্টি বেশির ভাগই স্থির হয়ে রয়েছে হাতে ধরা বইয়ে, কেবল মাঝে মাঝে সেটা চলে যাচ্ছে টেবিলে শোয়ানো লাশটার ওপর। এরকম পরিবেশে দুঃসাহসী মানুষও নানারকম কল্পনা করে, কিন্তু তার মধ্যে সেরকম কোনও লক্ষণ নেই। সে যেন তাকাচ্ছে পড়তে পড়তে হঠাৎ করে লাশটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে বলে।

আধ ঘন্টা মত পড়ার পর, সম্ভবত একটা অধ্যায় শেষ করে, বইটা নামিয়ে রাখল সে। তারপর মেঝে থেকে রীডিং-স্ট্যাণ্ডটা তুলে, সেটাকে নিয়ে গেল ঘরের কোণের একটা জানালার কাছে, তারপর সেখান থেকে মোমবাতিটা উঠিয়ে নিয়ে, ফিরে এল তার বসার জায়গায়, শূন্য ফায়ারপ্লেসের সামনে।

মিনিটখানেক পর টেবিলের কাছে গিয়ে, লাশটার মুখের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে দিল সে। পাতলা একটা কাপড়ে লাশের মুখ ঢাকা, মাথা ভরা কালো চুল। গম্ভীর মুখে সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার নিশ্চল সঙ্গীটির দিকে, তারপর চাদরটা নামিয়ে দিয়ে, চেয়ারের কাছে ফিরে এসে, মোমবাতিদান থেকে দেশলাই নিয়ে, স্যাককোটের পাশের পকেটে রেখে বসে পড়ল। তারপর সকেট থেকে মোমবাতিটা তুলে নিয়ে গভীর মনোযোগে সে যেন পরীক্ষা করল, ওটা আর কতক্ষণ টিকবে। ইঞ্চি দুই লম্বা ছিল মোমবাতিটা; ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই এই ঘরে নেমে আসবে অন্ধকার। মোমবাতিদানে আবার মোমবাতিটাকে বসিয়ে নিভিয়ে দিল সে এক ছুঁয়ে।।

- - - - - - - - - - - - -

কেয়ারনি স্ট্রীটের এক ডাক্তারের অফিসে টেবিল ঘিরে তিনজন লোক বসে আড্ডা দিচ্ছিল। সময় প্রায় মাঝরাত। তিনজনের মধ্যে বয়োজ্যষ্ঠ ডা. হেলবারসন, এই আয়োজন করেছে; তার ঘরেই বসেছে আসর। ডা. হেলবারসনের বয়েস ত্রিশ ছুঁইছুঁই; অন্য দুজন আরও কমবয়েসী; সবাই ডাক্তার।

মৃতকে দেখে মানুষের যে-কুসংস্কারাচ্ছন্ন আতঙ্ক, বলল ডা. হেলবারসন, সেটা বংশগত এবং সংশোধনের অসাধ্য। এ নিয়ে লজ্জা পাবার কিছু নেই, এটা অনেকটা জন্মগতভাবে অঙ্কে কাঁচা কিংবা মিথ্যে বলার প্রবণতার মত।  

অন্য দুজন হেসে উঠল। মিথ্যেবাদী হলেও একজন মানুষের লজ্জা পাবার কিছু নেই?' বলল সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি, যে আসলে মেডিকেলের ছাত্র, এখনও ডাক্তার হয়নি।

প্রিয় হারপার, আমি ঠিক তা বলিনি। মিথ্যে কথা বলার প্রবণতা এক কথা, মিথ্যে বলা আরেক।  

কিন্তু আপনি কী মনে করেন,' বলল তৃতীয়জন, এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন অনুভূতি, মৃতকে দেখে আতঙ্ক, একটা সার্বজনীন ব্যাপার? আমার কিন্তু এরকম কখনও মনে হয়নি।  

এই আতঙ্ক-তোমার দৈহিক গঠনতন্ত্রের মধ্যেই রয়েছে, জবাব দিল হেলবারসন। প্রয়োজন কেবল উপযুক্ত পরিবেশ-শেকসপীয়র যাকে বলেছেন কনফেডারেট সীজন উপযুক্ত পরিবেশ পেলে লুকানো আতঙ্ক প্রকাশিত হয়ে তোমাকে অবাক করে দেবে। অবশ্য অন্যান্য মানুষের চেয়ে ডাক্তার আর সৈন্যেরা এই আতঙ্কের হাত থেকে অনেকটা মুক্ত।  

ডাক্তার আর সৈন্য-এর সঙ্গে জল্লাদ আর মুণ্ড শিকারীদের যোগ করলেন না কেন? শ্রেণীতে সব ঘাতকেরাই অন্তর্ভুক্ত হোক।

না, প্রিয় মানচার, জুরিরা সরকারি ঘাতকদের ঘাতক বলে মেনে নেবে না, যদিও মৃত্যু কার্যকরী করার সময় ওরাই সবচেয়ে অবিচল থাকে।  

সাইডবোর্ড থেকে একটা চুরুট নিয়ে আবার এসে বসল হারপার। উপযুক্ত পরিবেশ বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?

যদি কাউকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয় একটা লাশের সঙ্গে-একা, পরিত্যক্ত কোনও বাড়ির অন্ধকার একটা ঘরে, সারা রাত ওভাবে থাকার পরেও সে যদি পাগল না হয়ে যায়, তা হলে তাকে অসমসাহসী বলতে হবে।  

আমার মনে হয় আপনর শর্তের কোনও শেষ হবে না, বলল হারপার; কিন্তু আমি একজন মানুষকে চিনি যে ডাক্তারও নয় সৈন্যও নয়, তবু আপনার সমস্ত শর্ত মেনে নিয়ে যে-কোনও অঙ্কের বাজি ধরতে প্রস্তুত।

সেই মানুষটা কে?  

তার নাম জ্যারেট-ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন, বাড়ি নিউ ইয়র্কে, আমাদেরই শহরে। আমি অবশ্য টাকা দিতে পারব না, তবে বাজি ধরার কথা শুনলে সে নিজেই বোঝ বোঝা টাকা জোগাড় করবে।  

তুমি কীভাবে জানলে?  

সে বরং অনাহারে থাকতে রাজি, কিন্তু বাজি না ধরে থাকতে রাজি নয়। মুশকিল হলো, আতঙ্কিত হবার মত কিছু আছে বলে সে বিশ্বাসই করে না।  

সে দেখতে কেমন? আগ্রহী হয়ে উঠল হেলবারসন।

মানচারের মত, দেখলে মনে হবে তার যমজ ভাই।  

আমি বাজি ধরতে প্রস্তুত, ঝটপট বলল হেলবারসন।

আমিও কি এই বাজিতে যোগ দিতে পারি? বলল মানচার।

আমার বিপক্ষে নয়, বলল হেলবারসন। আমি তোমার টাকা চাই না।'

বেশ, বলল মানচার; তা হলে আমি হব লাশ।

অন্য দুজন হেসে উঠল।

এই অদ্ভুত কথাবার্তার ফল কী হয়েছে, সেটা আমরা আগেই দেখেছি।

- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

মোমবাতিটাকে জ্যারেট নিবিয়ে দিল অচিন্তিত পূর্ব কোনও প্রয়োজনের কথা ভেবে। হয়তো সে এ-কথাও ভাবল যে দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়, এই সামান্য আলোটুকুও তখন স্বস্তি জোগাবে। তা ছাড়া, অন্তত ঘড়ি দেখতেও তো আলোর প্রয়োজন।

নেবানো মোবাতিটা মেঝের ওপর রেখে, পাশেই আর্মচেয়ারে বসে পড়ল সে। আরাম করে হেলান দিয়ে, চোখ বুজে অপেক্ষা করতে লাগল ঘুমের জন্যে। কিন্তু ঘুমের লেশমাত্র নেই চোখে, ফলে ঘুমের চেষ্টা বাদ দিল। ভাবতে লাগল, সময় কাটাবে কীভাবে। হাতড়ে হাতড়ে ঘুরে বেড়াবে গাঢ় অন্ধকারে? কিন্তু এতে লাশের সঙ্গে ধাক্কা খাবার সমূহ সম্ভাবনা। জ্যারেট বিশ্বাস করে, মৃত্যুর পর একজন মানুষের শান্তিতে থাকার অধিকার আছে। তাই উঠে বসেই রইল সে।।

সময় কাটাবার চিন্তা করতে করতেই তার মনে হলো, ক্ষীণ একটা শব্দ যেন ভেসে এল টেবিলের দিক থেকে। শব্দটা কেমন ধরনের ঠিক বুঝতে পারল না। মাথা ঘোরাল না সে, অন্ধকারে মাথা ঘোরালেও কিছু দেখতে পাওয়া যায় না; তবে কান পেতে রইল, অন্ধকারে শুনতে কোনও অসুবিধে নেই। মাথা ঘুরতে লাগল তার, দুহাতে চেপে ধরল চেয়ারের হাতল। কানের ভিতরে ভো ভো করতে লাগল; মাথাটা মনে হলো ফেটে যাবে; জামা যেন বুকে সেঁটে গিয়ে বন্ধ করে দিতে চাইল দম। অবাক হয়ে ভাবল, এরকম হচ্ছে কেন, আতঙ্কের একটা অনুভূতি যেন জেগে উঠতে চাইছে ভিতর থেকে। হঠাৎ করেই মাথা ঘোরা ছেড়ে গেল, স্বাভাবিক হয়ে এল শ্বাস। উঠে লাথি দিয়ে চেয়ারটাকে সরিয়ে দিল, বড় বড় ধাপে এসে দাঁড়াল ঘরের মাঝখানে। কিন্তু অন্ধকারে বেশিক্ষণ বড় বড় ধাপ ফেলা যায় না; সে হাতড়াতে লাগল, হাতড়াতে হাতড়াতে দেয়াল পেয়ে, কোনাকুনিভাবে এগিয়ে, জানালা দুটো পেরিয়ে ঘরের আরেক কোনায় আসতেই জোর সংঘর্ষ হলো, উল্টিয়ে ফেলে দিল রিডিং-স্ট্যাণ্ডটা। ঝন ঝন করে বিকট শব্দ চমকে তুলল তাকে। বিরক্ত হয়ে জ্যারেট ভাবল, ওটার অবস্থান সে ভুলে গেল কীভাবে! হাতড়াতে হাতড়াতে এবার এল ফায়ারপ্লেসের কাছে। মেঝেতে মোমবাতিটা খুঁজতে খুঁজতে বিড় বিড় করে বলল, ওটাকে তুলে রাখতে হবে।

মোমবাতিটা পেতেই জ্বালল সে, আর তৎক্ষণাৎ তাকাল টেবিলের দিকে। সেখানে কোনও পরিবর্তনের চিহ্ন নেই। রিডিং স্ট্যাণ্ডটা পড়েই রইল মেঝেতে, ওটাকে তুলে রাখার কথা ভুলে গেল জ্যারেট। ঘরের চারদিকে তাকাল, তারপর দরজার কাছে গিয়ে পাক দিল নবে। ঘুরল না নব। এতে খুশি হয়ে ছিটকিনি লাগিয়ে আরও শক্ত করে বন্ধ করে দিল দরজাটা। ফিরে এসে চেয়ারে বসে ঘড়ি দেখল; সাড়ে নটা বাজে। অবাক হয়ে ঘড়িটা তুলে কানে লাগাল। ঘড়ি বন্ধ হয়নি। মোমবাতিটা আরও ছাট হয়ে গেছে। আবারু ওটাকে নিবিয়ে সে নামিয়ে রাখল মেঝের ওপর।

স্বস্তি আর ফিরে এল না জ্যারেটের মনে। এখানে ভয় পাবার কী এমন আছে? ভাবল সে। একটা লাশকে ভয় পাবার কোনও মানে হয় না, এতবড় বোকা হতে আমি রাজি নই। না, এতবড় বোকা হতে আমি রাজি নই। কিন্তু আমি সাহসী হব বললেই সাহস ফিরে আসে না। অযথা ভয় পাবার জন্যে যতই নিজেকে দোষ দিতে লাগল, ততই বাড়ল যুক্তির সংখ্যা। যতই ভাবল যে মানুষের ক্ষতি করার কোনও শক্তিই নেই নিশ্চল একটা লাশের, ততই না কমে আতঙ্ক আরও বাড়ল।

না! মানসিক যন্ত্রণায় শেষমেশ চিৎকার করে উঠল সে। কোনওরকম কুসংস্কার নেই আমার! ভূত-প্রেতে আমার বিশ্বাস নেই! সুতরাং আমি বাজিতে হারতে পারি না! মৃতকে নিয়ে যুক্তি খাড়া করার কোনও অর্থ হয় না! তবে হয়তো আমার মনে যুক্তি এসেছে এজন্যে যে, আমার গুহাবাসী পূর্বপুরুষেরা বিশ্বাস করত, মৃতেরা রাতে হেঁটে বেড়ায়; হয়তো- থেমে কান পাতল। হ্যা, কোনও ভুল নেই। হালকা, নরম একটা পদশব্দ পিছনে; একটা উদ্দেশ্য নিয়ে শব্দটা ক্রমেই এগিয়ে আসছে কাছে, আরও কাছে।

- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -

পরদিন ভোরের আলো ফোটার ঠিক আগে আগে ডা. হেলবারসন আর হারপার আস্তে আস্তে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল নর্থ বীচের রাস্তা ধরে।

তোমার কী মনে হয়, বলল হেলবারসন, তোমার বন্ধুর দুঃসাহস এখনও অটুট আছে? তোমার কি মনে হয় আমি বাজিতে হেরে গেছি?

হ্যাঁ, সেরকমই মনে হচ্ছে, জোরের সঙ্গে বলল হারপার।

সত্যি বলছি, আমারও তা-ই মনে হচ্ছে।  

কয়েকটা মিনিট কাটল নীরবতায়।

হারপার, গম্ভীর মুখে বলল হেলবারসন, আমার কিন্তু কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। তোমার বন্ধুটির সঙ্গে কথা বলেই বুঝেছি, সে বড় সহজ পাত্র নয়আবার বলে কিনা, লাশটা কোনও ডাক্তারের হলেই ভাল হয়। যদি কিছু ঘটে, তা হলে আমরা কিন্তু শেষ।  

কী ঘটবে? যদি ঘটনা সত্যিই খারাপের দিকে মোড় নেয়-আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে তেমন কোনও সম্ভাবনা নেই-মানচার স্রেফ উঠে বসে পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করে বলবে। ব্যস, ঝামেলা শেষ। ডিসেকটিং-রুমের সত্যিকার কোন লাশ হলে আলাদা কথা ছিল।  

(বলা বাহুল্য, কথামত ডা. মানচার লাশ সেজেছিল।)  

ডা. হেলবারসন আবার চুপ করল। গাড়ি শামুকের গতিতে একেক রাস্তায় দুতিন বার করে যেতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে হেলবারসন বলল, আশা করি মানচার যদি উঠে বসতেই বাধ্য হয়ে থাকে, কাজটা সে করেছে সতর্কতার সঙ্গে। এ-ব্যাপারে সে যদি কোনও ভুল করে, তা হলে ভাল না হয়ে ঘটনা আরও খারাপ হতে পারে।

হ্যা, বলল হারপার, জ্যারেট ওকে হত্যা করতে পারে। কিন্ত-গ্যাস-বাতির আলোয় ঘড়ি দেখল সে-প্রায় চারটে বাজে।

একটু পরেই গাড়ি থেকে নেমে পরিত্যক্ত বাড়িটার দিকে এগোতে লাগল দুজনে। বাড়িটার কাছাকাছি যেতেই দৌড়াতে দৌড়াতে একজন লোক এসে থামল তদের পাশে।

ডাক্তার পাব কোথায় বলতে পারেন?

কী ব্যাপার? জানতে চাইল হেলবারসন।

গিয়ে নিজেই দেখুন না, আবার দৌড়াতে লাগল লোকটা।

গতি বাড়াল তারা। বাড়িটাতে পৌছে দেখল, অনেক লোক ছুটে ভিতরে ঢুকছে, তাদের চোখে-মুখে উত্তেজনা। আশপাশের বাড়ির জানালাগুলোতেও গিজগিজ করছে লোকের মাথা। সবাই প্রশ্ন করছে, অন্যের প্রশ্ন শুনছে না। কোনও কোনও জানালার খড়খড়ি নামানো, ভিতরে আলো জ্বলছে: ওই ঘরগুলোর বাসিন্দারা তৈরি হলো এখানে আসার জন্যে। হেলবারসনের বাহু ধরে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে হারপার, মুখ তার মড়ার মত ফ্যাকাসে। ঘটনা খুব খারাপ মনে হচ্ছে, এখানে গেলে ফেঁসে যাব আমরা। তার চেয়ে পালিয়ে যাই চলুন।  

আমি একজন ডাক্তার, বলল হেলবারসন ঠাণ্ডা স্বরে, ওখানে হয়তো একজন ডাক্তারের প্রয়োজন।  

রাস্তার বাতির আলো এসে পড়েছে খোলা দরজার মুখের প্যাসেজের ওপর। প্যাসেজে লোক গিজগিজ করছে। কেউ কেউ ভিতরে ঢুকতে পেরেছে, যারা পারেনি তারা সুযোগের অপেক্ষায় আছে। একসঙ্গে কথা বলছে সবাই, কিন্তু শুনছে না কেউই। হঠাৎ একটা ভীষণ হৈচৈ শুরু হলো সিড়ির মাথায়। একটা দরজা দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে এল একজন লোক, নামতে লাগল সিড়ি দিয়ে। যারা তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করল তাদের কাউকে সে ধাক্কা দিল, কাউকে ঘুসি মারল, ঠেসে ধরল কাউকে দেয়ালের সঙ্গে, কারও গলা টিপে ধরল, পড়ে গেলে মাড়িয়ে গেল নির্দয়ভাবে। লোকটার কাপড় আলুথালু, মাথায় হ্যাট নেই। চোখে অস্থির, বন্য দৃষ্টি, শরীরে আসুরিক শক্তি। মসৃণভাবে শেভ করা মুখ রক্তশূন্য, মাথার চুল বরফের মত সাদা।

সিড়ির নীচের লোকজন যে যেদিকে পারল সরে গিয়ে তাকে জায়গা করে দিল। লাফিয়ে সামনে এসে হারপার চেঁচাল, জ্যারেট! জ্যারেট!  

কলার ধরে হারপারকে পিছনে সরিয়ে আনল ডা. হেলবারসন। কয়েক মুহূর্ত লোকটা এমনভাবে তাকিয়ে রইল দুজনের দিকে যেন জীবনেও তাদের দেখেনি, তারপর লাফ দিয়ে রাস্তায় পড়ে এক দৌড়ে উধাও হয়ে গেল। শক্তসমর্থ একজন পুলিশ এতক্ষণ চেষ্টা করেও ভিতরে ঢুকতে পারেনি, ছুটে গেল সে লোকটাকে তাড়া করে, জানালায় মাথা বের করে রাখা মহিলা আর শিশুরা চিৎকার করে তাকে উৎসাহ জোগাতে লাগল।

সিড়ি এখন অনেকটা ফাঁকা, বেশির ভাগ লোক রাস্তায় নেমে এসেছে পালানো আর তাড়া করা দেখতে। এই সুযোগে হেলবারসন ওপরে উঠে গেল, পেছনে পেছনে হারপার। প্যাসেজের মুখে একজন পুলিশ অফিসার বাধা দিল তাদের। হেলবারসন বলল, আমরা ডাক্তার। অফিসার সরে গেল সামনে থেকে। ঘরভর্তি মানুষ, সবাই টেবিলটাকে ঘিরে। দুজনে ধীরে ধীরে এগিয়ে সামনের লোকগুলোর কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল। টেবিলের ওপর পড়ে আছে একটা লোক, কোমরের নীচের অংশ চাদর দিয়ে ঢাকা। পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পুলিশের হাতে ধরা বুলস-আই লণ্ঠনের আলোয় টেবিলটা চমষ্কারভাবে আলোকিত। এ ছাড়া মাথার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অফিসারসহ কয়েকজনকে দেখা যাচ্ছে, বাদবাকিরা অন্ধকারে। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা লোকটার মুখ হলুদ, বীভৎস, ভয়ঙ্কর। ওপরদিকে ওল্টানো চোখ সামান্য খোলা, চোয়াল স্কুলে পড়েছে; ফেনা গড়িয়ে নোংরা হয়ে আছে ঠোট, চিবুক আর গাল। লম্বা একটা লোক, নিঃসন্দেহে ডাক্তার, ঝুকে পড়ে তার হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে জামার ভিতরে। একটু পর হাত বের করে নিয়ে সে দুটো আঙুল ঢোকাল লোকটার মুখে। এই লোক প্রায় দু'ঘণ্টা আগে মারা গেছে, অবশেষে বলল সে। এটা এখনও করোনারের কেস।  

পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে পা বাড়াল সে দরজার দিকে।

ঘর ফাঁকা করুন-বেরিয়ে যান, বেরিয়ে যান সবাই তীক্ষ্ণ চিষ্কার করে, পুলিশ কনস্টেবলের হাত থেকে বুলস-আই লণ্ঠনটা নিয়ে সবার মুখে আলো ফেলতে লাগল অফিসার। হঠাৎ এই কাণ্ডে দারুণ প্রতিক্রিয়া হলো। তীব্র আলোয় চোখ ধাধিয়ে যাওয়ায় পাগলের মত ছুটতে লাগল লোকজন। একজন আরেকজনের সঙ্গে ধাক্কা খেলো, কে কোথায় ছিটকে পড়ল। কিন্তু এই আতঙ্ক সত্ত্বেও নির্দয়ভাবে সবার মুখে আলোর ঝাটা মারা অব্যাহত রাখল অফিসার। ছুটন্ত লোকের ধাক্কায় ধাক্কায় ঘর থেকে বেরিয়ে, সিড়ি দিয়ে নেমে, নীচের রাস্তায় এসে পড়ল হেলবারসন আর হারপার।।

হায় ঈশ্বর! আমি আপনাকে বলিনি যে জ্যারেট ওকে হত্যা করতে পারে? লোকজনের ভিড় ছেড়ে ফাঁকায় আসতেই বলল হারপার।

হ্যা, জবাব দিল হেলবারসন। নীরবে হেঁটে চলল তারা, ব্লকের পর ব্লক। ধূসর হয়ে আসা পুবাকাশের নীচে দেখা যেতে লাগল পাহাড়ীদের ছায়া। রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে দুধের ওয়াগন; শিগগিরই বেরিয়ে আসবে রুটিঅলারা; আর ইতিমধ্যেই দূরদূরান্তে চলে গেছে সংবাদপত্রের গাড়ি।  

মনে হচ্ছে, বলল হেলবারসন, ভোরের বাতাসে খুব বেশি হাঁটাহাঁটি করেছি আমি আর তুমি। এটা স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর। আবহাওয়া পরিবর্তন করা দরকার। ইউরোপ ভ্রমণে গেলে কেমন হয়?

কখন?

ঠিক জানি না। আজ বিকেল চারটেয় গেলে মনে হয় খুব দেরি হবে না।  

যথাসময়ে আপনার সঙ্গে দেখা হবে জাহাজে, বলল হারপার।

পাঁচ সাত বছর পর এই দুজন লোককে আবার দেখা গেল নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে। একটা বেঞ্চে বসে গল্পগুজব করছিল তারা। আরেকজন লোক তাদের অজান্তে খানিকটা দূর থেকে শুনছিল সেই গল্প। কিছুক্ষণ পর লোকটা উঠে তাদের কাছে গিয়ে, বরফের মত সাদা চুলে ভরা মাথা থেকে হ্যাট খুলে অভিবাদন জানিয়ে বলল, কিছু মনে করবেন না, আমার ধারণা, লাশের ভান করে থাকা কোনও লোক ঘটনাচক্রে কাউকে হত্যা করতে বাধ্য হলে, মৃত লোকের সঙ্গে পোশাক বদলাবদলি করে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়াই ভাল।

অর্থপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করল হেলবারসন আর হারপার। দুজনেই বেশ অবাক হয়েছে। অবশেষে অপরিচিত লোকটার দিকে নরম চোখে তাকিয়ে হেলবারসন জবাব দিল, আমার পরিকল্পনা বরাবর এরকমই ছিল। আপনার ধারণার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ...

হঠাৎ থেমে গেল হেলবারসন, মুখটা মড়ার মত ফ্যাকাসে। হাঁ করে তাকিয়ে রইল সে লোকটার দিকে; সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে।

আরে ডাক্তার! বলল লোকটা, আপনি তো দেখছি অসুস্থ। নিজের চিকিৎসা যদি করতে না পারেন, ডা. হারপার মনে হয় আপনাকে এ-ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবেন।  

লোক আপনি সুবিধের নন, আসলে আপনি কে বলুন তো? সোজাসুজি জিজ্ঞেস করল হারপার।

আরও কাছে এসে, তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে, ফিসফিস করে লোকটা বলল, নিজেকে আমি মাঝেমাঝে জ্যারেট নামে পরিচয় দিই, কিন্তু পুরনো বন্ধুত্বের খাতিরে আপনাদের কাছে আসল পরিচয় দিতে আপত্তি নেই আমার। আমি ডা. উইলিয়াম মানচার।

বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে গেল দুজনেই। মানচার! চেঁচাল তারা সমস্বরে; তারপর হেলবারসন বলল, হায় ঈশ্বর, এ কি সত্য!

হ্যা, অদ্ভুতভাবে হাসল লোকটা, নিঃসন্দেহে। থেমে কী যেন একটা মনে করার চেষ্টা করল সে, তারপর গুনগুন করে গাইতে লাগল জনপ্রিয় একটা গান।।

শোনো, মানচার, বলল হেলবারসন, আমাদের বলো দেখি, কী ঘটেছিল সেরাতে-জ্যারেটের।।

, হ্যা, হ্যা, জ্যারেট, বলল সে। গল্পটা আপনাদের আগেই বলা উচিত ছিলএই গল্প আমি প্রায়ই বলি। লাশ হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে শুনি, ভীষণ ভয় পেয়ে আপনমনে কথা বলছে জ্যারেট। তখন একটা মজা করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না টেবিল থেকে নেমে হাঁটতে লাগলাম ধীরে ধীরে, ভাবতেই পারিনি যে ব্যাপারটাকে সে এত গুরুত্ব দেবে। উফ, লাশের সঙ্গে পোশাক বদল করা কি সোজা ঝামেলা! তারপর বের হতে গেলাম। কিন্তু আপনারা আপনারা আমাকে বের হতে দেননি।  

শেষে কথাগুলো এত হিংস্রতার সঙ্গে বলা হলো যে দুজনেই কয়েক ধাপ পিছিয়ে গেল তীব্র আতঙ্কে।

আমরা?-কেন?-কেন? তোতলাতে লাগল হেলবারসন, এতে আমাদের কোনও হাত নেই।   

আপনারা দুজন তো ডা. হেলবর্ন আর ডা. শারপার; তাই না? হেসে উঠল সে উন্মাদের মত।

আমার নাম হেলবারসন, আর এ হলো হারপার। কিন্তু এখন আমরা আর ডাক্তার নই। এখন আমরা, মানে, জুয়াড়ি-বাজি ধরি, হেলবারসন সত্য কথা বলল।

জুয়া-বাজি ধরা, বলল সে মাথা নাড়াতে নাড়াতে, চমক্কার পেশা-অত্যন্ত চমৎকার, আশা করি সমস্ত সৎ জুয়ারীর মত জ্যারেটের গচ্ছিত বাজির টাকা মিটিয়ে দেবেন। জুয়াবাজি ধরাঅত্যন্ত চমৎকার, সম্মানজনক পেশা, বলল সে আবার, তারপর যেন ডুবে গেল গভীর ভাবনায়; কিন্তু আমি আমার পুরানো পেশাটাকেই ধরে আছি। আপনারা অসুস্থ, মাথারও দোষ আছে মনে হচ্ছে। ভাববেন না, অসুস্থকে সুস্থ করে তোলাই ডাক্তারের ধর্ম। কাছেই রুমিংটন পাগলা গারদ। ভর্তির জন্যে কোনওরকম দুশ্চিন্তা করবেন না, আমি সেখানকার হাই সুপ্রীম মেডিক্যাল অফিসার।   

মূল: অ্যামব্রোস বিয়ার্স

রূপান্তর: খসরু চৌধুরী

No comments:

Post a Comment

Popular Posts