মজার গল্প, উপন্যাস, গোয়েন্দা কাহিনী, ছোট গল্প, শিক্ষামূলক ঘটনা, মজার মজার কৌতুক, অনুবাদ গল্প, বই রিভিউ, বই ডাউনলোড, দুঃসাহসিক অভিযান, অতিপ্রাকৃত ঘটনা, রুপকথা, মিনি গল্প, রহস্য গল্প, লোমহর্ষক গল্প, লোককাহিনী, উপকথা, স্মৃতিকথা, রম্য গল্প, জীবনের গল্প, শিকারের গল্প, ঐতিহাসিক গল্প, অনুপ্রেরণামূলক গল্প, কাহিনী সংক্ষেপ।

Saturday, September 5, 2020

ছোট গল্প - আ হাঙ্গার আর্টিস্ট - ফ্রান্‌ৎস কাফকা – বাংলা অনুবাদ - A Hunger Artist - Franz Kafka – Bengali Translation

 

ছোট গল্প -  হাঙ্গার আর্টিস্ট - ফ্রান্ৎস কাফকা – বাংলা অনুবাদ - A Hunger Artist - Franz Kafka – Bengali Translation

ছোট গল্প - হাঙ্গার আর্টিস্ট - ফ্রান্ৎস কাফকাবাংলা অনুবাদ - A Hunger Artist - Franz Kafka – Bengali Translation

বিগত দশকে পেশাদার ক্ষুধশিল্প নিষিদ্ধ করা হয়েছে সে সময় ক্ষুধশিল্পীরা (Hunger Artist) পেশাদারভাবে না খেয়ে থেকে ভালই উপার্জন করত, এখন আর সে সুযোগ নেই এখন আমরা একটি পরিবর্তিত পৃথিবীতে বাস করি এক সময় পুরো শহর ক্ষুধাশিল্পীদের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দিয়েছে তার অভুক্ত দিনের সংখ্যা যত বাড়ত, মানুষের উত্তেজনাও বাড়ত সমান তালে; প্রত্যেকেই দিনে অন্তত একবার এই ক্ষুধশিল্পীকে দেখতে উন্মুখ ছিল; কেউ কেউ তো সারাদিনের জন্য টিকেট কেটে শিল্পীর খাঁচার সামনে বসে থাকত; এমনকী রাতেও ভিজিটিং আওয়ার চলত, যখন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু শিল্পীকে আলো ফেলে ফোকাস করে রাখা হত; বৃষ্টিহীন দিনগুলোতে খাঁচাটা খোলা আকাশের নীচে রাখা হত, তখন ক্ষুধশিল্পী হয়ে উঠত শিশুদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু; আর তাদের অভিভাবকদের জন্য সে ছিল এক কৌতুককর বিষয়-একধরনের ফাশন মনে করতেন তারা এটাকে, কিন্তু শিশুরা হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখত, একে অন্যের হাত ধরে রাখত যেন তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে, বিস্মিত হয়ে দেখত খাঁচার ভেতর হেলান দিয়ে বসে থাকা দুর্বল ক্ষুধশিল্পীকে-যার পাঁজরের হাড়গুলো এতদূর থেকেও তারা গুণে নিতে পারত, তার বসে থাকার জন্য কোনও গদিও ছিল না-সে বসে থাকত খড়কুটোর গাদায়; কেউ কেউ কৌতূহলবশত দুএকটা প্রশ্ন করত তাকে, সে শুধু মাথাটা ঈষৎ নেড়ে উত্তর দিত, কদাচিৎ অল্প হাসতও, কখনও বা খাঁচার ফাক দিয়ে একটি হাত এগিয়ে দিত যেন কৌতূহলী দর্শক অনুভব করতে পারে সে কতটা শীর্ণ, আর তারপর আবার সে মাথা নিচু করে নিজের মধ্যে ডুবে যেত, কোনওদিকেই আর কোনও মনোযোগ দিত না সে, এমনকী তার খাঁচার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসবাব টিকটিক করতে থাকা ঘড়িটাকেও সে ভুলে যেত, শুধু চোখটা অর্ধেক বুজে শূন্য চোখে চেয়ে থাকত, মাঝে মধ্যে শুধু গেলাস থেকে দুএক ঢোক পানি চুমুক দিয়ে টেনে নিত 

টিকেট কেটে ঢোকা যাত্রীদের পাশাপাশি নির্বাচিত কিছু স্থায়ী দর্শকও থাকত, অদ্ভুত হলেও সত্য, সচরাচর কসাইরাই এই পদে নিয়োগ পেত, এবং তাদের কাজ ছিল দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা ক্ষুধশিল্পীর উপর নজর রাখা যাতে লুকিয়ে কোনও খাবারের বন্দোবস্ত সে করতে না পারে এটা শুধু একটা ফরমালিটি ছাড়া আর কিছু ছিল না, দর্শকদের সন্তুষ্ট রাখা শুধু, কারণ কর্তৃপক্ষ জানত, ক্ষুধশিল্পী কোনও অবস্থাতেই-এমনকী জোর করলেও এক গ্রাস খাবারও মুখে তুলবে না; তার নিজের পেশার প্রতি শ্রদ্ধাই তাকে বিরত রাখবে দর্শকরা সবাই তা বুঝত না, তাই তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে পর্যবেক্ষকের ব্যবস্থা করতে হত কিছু দর্শক তার খাঁচার পাশেই আড্ডা জমিয়ে বসত, তাস পেটাত; তারা ভাবত, এতে বোধহয় ক্ষুধশিল্পীকে একটু রিল্যাক্স দেয়া হচ্ছে; কিন্তু সত্য হচ্ছে এই, এই দর্শকদেরই সে সবচেয়ে অপছন্দ করত, এই ধরনের দর্শকরা তাকে ক্লান্ত করত, তার অভুক্ততার সময়কে হ্রাস করে দিত; মাঝে মাঝে সে দুর্বল কণ্ঠে গান গাইত যতক্ষণ পারা যায় যাতে করে ওই দর্শকরা বুঝতে পারে সে ক্লান্ত নয়, সে রিল্যাক্স চায় না, সে চায় মানুষ তাকে দেখুক, এজন্যই তো সে না খেয়ে আছে কিন্তু তার এই চেষ্টা খুব একটা কাজে আসত না; তারা অবাক হয়ে ভাবত, সে বোধহয় গোপন কোনও উৎস থেকে খাবার জোগাড় করেছে এবং এ জন্যই এই গান বেরোচ্ছে; নইলে এতদিন কেউ না খেয়ে থাকতে পারে? কিছু দর্শক শুধু কর্তৃপক্ষের দেয়া আলোতে সন্তুষ্ট থাকত না, পকেট থেকে বৈদ্যুতিক টর্চ বের করে আলো ফেলে তাকে দেখত এই রুক্ষ আলো ক্ষুধশিল্পীকে একেবারেই বিরক্ত করত না, সে কখনোই ভাল করে ঘুমোতে পারত না কিন্তু ঝিমোতে পারত সবসময়, তা সে আলোর তীব্রতা যতই হোক, এমনকী দিনের বেলা যখন হাজার মানুষ তাকে দেখতে আসত তখনও এই ধরনের দর্শকদের সাথে নির্ঘুম রাত কাটাতে তার ভালই লাগত; সে তাদের সাথে হাসি-তামাশা করতেও প্রস্তুত ছিল, চাইত তাদেরকে তার যাযাবর জীবনের কাহিনি শোনাতে, সে যে আসলেই না খেয়ে আছে এবং তার যে গোপন কোনও খাদ্যের উৎস নেই, সেটা তাদের বোঝানোর জন্য সে সবকিছুই করতে প্রস্তুত ছিল, সকালবেলা এই দর্শকদের জন্য নিজ খরচে সে খাবার আনাত-সেটা ছিল তার সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত, দর্শকরা ঝাঁপিয়ে পড়ত খাবারের উপর, তবু তাদের সন্দেহ সহজে যেত না 

এ ধরনের সন্দেহ অবশ্য একটি প্রয়োজনীয় বৈশিষ্ট্য ছিল ক্ষুধশিল্পের কেউই একা দিনরাত ক্ষুধশিল্পীকে একটানা চোখে চোখে রাখতে পারত না, ফলে কেউই দাবি করতে পারত না, শিল্পী সত্যি একটানা না খেয়ে আছে; একমাত্র শিল্পীই সেটা জানত, কাজেই সে একাই ছিল নিজের অভুক্ত থাকার প্রমাণ, একমাত্র সন্তুষ্ট দর্শক অন্যদিকে আবার সে কখনই সন্তুষ্ট ছিল না; সে ছাড়া আর কেউ জানল না, না খেয়ে থাকা কতই না সহজ! এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ সে কিছুই গোপন করত না, তবু মানুষ তাকে অবিশ্বাস করত না খেয়ে থাকার জন্য চল্লিশ দিনের সময়সীমা নির্দিষ্ট ছিল, এরপর কর্তৃপক্ষ আর অনুমতি দিত না এর মূল কারণ ছিল, চল্লিশ দিন পর আর দর্শকের উৎসাহ থাকে না, দিনের পর দিন একজন ক্ষুধার্ত মানুষ তারা দেখতে চায় না কাজেই চল্লিশ দিন পর খাচা খোলা হত, কৌতূহলী দর্শকরা জড়ো হত সেখানে, ব্যাণ্ডপার্টি বাদ্যযন্ত্র নিয়ে হাজির হত, দুজন ডাক্তার খাঁচায় ঢুকে পরীক্ষা করত ক্ষুধশিল্পীর শারীরিক অবস্থা, তারপর তারা মাইক্রোফোনে সেটা ঘোষণা করত, দুজন নির্বাচিত তরুণী উপস্থিত হত, তারা তাকে নিয়ে যেত একটি টেবিলে যেখানে খাবার রাখা থাকত, কিন্তু ক্ষুধশিল্পী প্রায়শই খেতে অস্বীকার করত, কেন খাবে সে? কেন চল্লিশ দিন পরই খাওয়া শুরু করতে হবে? অনেকক্ষণ গোঁ ধরে বসে থাকত সে, কেন এখন অভুক্ত থাকা বন্ধ করে দিতে হবে যখন সে তার অভুক্ততার শিখরে আছে? আরও না খেয়ে থাকলে যে রেকর্ডটা তার হবে, তা থেকে তাকে কেন বঞ্চিত করা হবে? যদিও রেকর্ড সে করেই ফেলেছে, তবু নিজের রেকর্ড নিজে ভাঙার চেয়ে আনন্দের আর কী আছে বিশেষ করে সে যখন উপলব্ধি করছে সে অগুনতি দিন না খেয়ে থাকতে পারে? দর্শকরা যে এত বাহবা দিচ্ছে তাকে, চল্লিশ দিনের বেশি না খেয়ে থাকলে এই বাহবা তারা দেয় না কেন? কেন তারা উৎসাহ হারিয়ে বসে থাকে? কত চমৎকার সে বসে ছিল খাচায় অলস ভাবে, আর এখন কি না তাকে খেতে হবে, আবার নামতে হবে জীবন যুদ্ধে? এতদিন খায়নি বলেই তো খাবারের সন্ধানে তাকে ছুটতে হয়নি-এই চিন্তা তার মধ্যে এক আদিম অবসাদ জাগিয়ে তুলত সে চোখ তুলে তরুণী দুজনের দিকে তাকাত, যারা দেখতে কত দয়ালু অথচ আসলে কত নিষ্ঠুর! শক্তিহীন ঘাড়ের উপর মাথাটা ঈষৎ নাড়ত সে কিন্তু তখনই আবার তাই ঘটত যা সবসময় ঘটে এসেছে আয়োজকদের প্রধান নিঃশব্দে এগিয়ে আসতেন-কারণ ব্যাণ্ডের আওয়াজ কথা বলা অসম্ভব করে দিয়েছে-ক্ষুধশিল্পীর মাথার উপর বাতাসে হাতটা তুলতেন তিনি, যেন ঈশ্বরকে আহ্বান জানাচ্ছেন খড়কুটোয় পড়ে থাকা তার সৃষ্টিকে, এই যন্ত্রণাকাতর শহীদকে দেখার জন্যে যে আসলেই তার ছিল, যদিও অন্য অর্থে; তারপর তিনি শিল্পীকে তার দুর্বল কোমর ধরে তুলতেন, একটু বেশি সতর্কতার সাথে; এবং তাকে নির্বাচিত সেবিকাদের হাতে সমর্পণ করতেন শিল্পী তখন পুরোপুরি সমর্পিত; মাথাটা বিমান অবতরণ করার মত পড়ে আছে বুকের উপর; তার শরীর বিপর্যস্ত, দু'হাঁটু একত্রিত হয়ে গিয়ে যেন নিজেদেরই সামাল দিতে ব্যস্ত, পায়ের পাতা দুটো মাটিতে এমন ভাবে পড়ে আছে যেন কোনও শক্ত ভিত্তি পাচ্ছে না দাঁড়ানোর; তারপর খাবার আসত, আয়োজক অনেক কষ্টে শিল্পীর ঠোটের ফাঁক দিয়ে কয়েক ফোটা নির্গত করতে সক্ষম হতেন, শিল্পী বসে থাকতেন অধচেতনের মত পূর্ণদ্যোমে ব্যাণ্ড বাজত, দর্শকেরা একে একে চলে যেত প্রত্যেকেই সন্তুষ্ট, একমাত্র শিল্পীই যথারীতি অসন্তুষ্ট

এমনই এক ক্ষুধাশিল্পীর কথা বলব অনেকদিন বেঁচেছিল সে, তার স্বাস্থ্যের তেমন উন্নতি হয়নি, পৃথিবী তাকে সম্মান দিয়েছে, ভুলেও গেছে, কেউই তার এই ক্ষুধশিল্পকে একটি বিনোদন ছাড়া কিছু ভাবেনি, এর পেছনে কত ত্যাগ, কত রাত জাগা যন্ত্রণা, এসব ভাবেনি কেউ মাঝেমাঝে সে ভাবে, সে আসলে কী চায়? কী সম্মান সে চায়? যদি কখনও কোনও সহৃদয় মানুষ তার অসন্তুষ্টি দেখে এই বলে সান্ত্বনা দিত যে একটানা না খেয়ে থাকার কারণেই তার এমন হয়েছে, সে হিংস্রতায় ফেটে পড়ত, খাঁচার শিক ধরে ঝাকাত পশুর মত আয়োজক তখন এগিয়ে আসতেন, জনতার কাছে এই বলে ক্ষমা চাইতেন যে, ক্ষুধা সইতে না পেরে শিল্পী অমন করেছে; পেটভর্তি খাবার নিয়ে যেসব লোকেরা প্রদর্শনীতে আসত, তারা এসব বুঝত না; আরও বেশিদিন সে না খেয়ে থাকতে পারবে বলে যে দাবি সে করে আসছিল, সেটাকে অহংকার ধরে নিয়ে সবাই সমালোচনা করত; আয়োজক একটি ছবি বের করতেন-যেটাও অবশ্যই ছিল বিক্রির জন্য-যেখানে না খেয়ে থাকার চল্লিশ দিনে একটি বিছানায় শিল্পী শুয়ে আছে প্রায় মৃত অবস্থায় সত্যের এই বিকৃতি যদিও শিল্পীর জন্য নতুন নয়, তবু প্রত্যেকটি বিকৃতি নতুন করে করে তার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিত তার ক্ষুধার্ত দিনের দ্রুত পরিসমাপ্তির ফলাফলকে এরা কারণ বলে দেখাতে চাচ্ছে! অবুঝ-নির্বোধ-অন্ধ এই মানুষগুলো, শুধু এরা নয়, পুরো পৃথিবীই অন্ধ-একা কী করে লড়বে এদের সাথে! খাঁচার ভেতরে দাঁড়িয়ে সে এদের কথা শুনত, কিন্তু যখনই আয়োজক ছবিটি বের করতেন, সে একটা গর্জন করে তার খড়কুটোর মধ্যে ফিরে যেত 

কয়েক বছর পরেই, যখন এই ক্ষুধশিল্পের দর্শকেরা এসব ঘটনা স্মরণ করতে চাইলেন, তারা নিজেদেরকেই বুঝতে পারলেন না কারণ, ততদিনে দর্শকদের আগ্রহ পরিবর্তিত হয়েছে; যেন রাতারাতি পরিবর্তন; হয়তো এর পেছনে কোনও কারণ আছে, কিন্তু কে তা নিয়ে মাথা ঘামাবে? একদিন ক্ষুধশিল্পী নিজেকে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ অবস্থায় আবিষ্কার করল, আনন্দে উত্তাল জনতা তার খাচাকে পাশ কাটিয়ে আরও বেশি আকর্ষণীয় কোনও বিনোদনের দিকে ছুটে গেল গতবার আয়োজক ক্ষুধশিল্পীকে নিয়ে ইউরোপের অর্ধেক ঘুরে এসেছিলেন এখনও লোকে ক্ষুধশিল্পের প্রতি আকৃষ্ট কিনা দেখার জন্য, ব্যর্থ সবার মধ্যেই যেন একটা অদ্ভুত বিতৃষ্ণা জন্মে গেছে ক্ষুধশিল্পের প্রতি আয়োজন এবং ক্ষুধশিল্পী-উভয়েই বিস্মিত হলেন, রাতারাতি নিশ্চয় দর্শকের মন বদলে যেতে পারে না; কোনও কারণ অবশ্যই আছে, কিন্তু এখন আর সে কারণ খোজারও আগ্রহ নেই কারও 

খেয়ে থাকাটা হয়তো ভবিষ্যতে আবারও কোনও ফ্যাশন হিসেবে আবির্ভূত হবে, কিন্তু বর্তমানে যারা বেঁচে আছে তাদের কী হবে? ক্ষুধশিল্পী এখন কী করবে? এক সময় হাজার মানুষের করতালিতে তার খাঁচার চারপাশ মুখরিত হয়েছে, আজ সে নিঃসঙ্গভাবে নেমে এল একটি গ্রামের মেলায় অন্য পেশার খোঁজে সে আজ শুধু বৃদ্ধই হয়ে যায়নি, মানসিক ভাবেও প্রচণ্ড ভেঙে পড়েছে সে তার আয়োজকের কাছ থেকে বিদায় নিল, তার ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘোষণা করল এবং একটি সার্কাস দলে নিজেকে ভাড়া দিল।। 

পশুপাখি, মানুষ আর নানান জিনিসপত্রে ভরপুর একটি সার্কাস দল সবসময়ই একজন চাকরিপ্রার্থীর জন্য উপকারে আসতে পারে, এমনকী একজন ক্ষুধশিল্পীর জন্যও, যদি না সে খুব বেশি আশা করে, আর এই ক্ষুধশিল্পীকে খুব সাদরেই গ্রহণ করা হলো কারণ তার আগে থেকেই সুনাম ছিল, আর তার কাজের বিশেষত্বের জন্যও, যেটা ক্রমশ অগ্রসরমান বিনোদনের ক্ষেত্রে অতুলনীয়, আর তার মত আর কেউ সার্কাস দলে নাম লেখায়নি বলে তার একটা বিশেষ চাহিদাও ছিল; সার্কাস দলের কাছে ক্ষুধশিল্পী দাবি করল যে সে আগের মতই না খেয়ে থাকার খেলা দেখাতে পারে যেটা ছিল তাকে নেয়ার মূল কারণ, সে আরও দাবি করল যদি তাকে তার ইচ্ছে মত অভুক্ত থাকতে দেয়া হয়, তবে সে এমন রেকর্ড করতে পারবে যেটা আগে কেউ কখনও করেনি 

সে তার প্রকৃত অবস্থা ভুলে যায়নি, কাজেই সে আবেদন করল তাকে এবং তার খাচাকে যেন সার্কাস রিং-এর মধ্যমণি করে না রেখে বাইরে রাখা হয়, অন্যান্য প্রাণীর খাচার সাথে, যাতে করে সবাই তাকে দেখতে পায় তার আবেদন গৃহীত হলো এবং একটি লেবেলে তার বিবরণ লিখে তাকে খাঁচার বাইরে রাখা হলো যখন দর্শকরা খাঁচাবন্দী পশুগুলোকে দেখতে আসত, ক্ষুধশিল্পীর খাঁচার সামনে একটু না দাঁড়িয়ে পারত না, হয়তো তারা আরও বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়াত যদি না লাইনে থাকা লোকগুলো পেছন থেকে ধাক্কা দিত ক্ষুধশিল্পী এই ভিজিটিং আওয়ারকেই তার দিনের শ্রেষ্ঠ সময় মনে করত প্রথমদিকে সে জনতার জন্য অস্থির হয়ে অপেক্ষা করত, তার খাঁচার সামনে স্রোতের মত জনসমুদ্র তাকে প্রেরণা দিত, কিন্তু খুব দ্রুতই সে আবিষ্কার করল, দর্শকরা তাকে অন্যান্য খাচাবন্দী প্রাণীর চেয়ে খুব একটা আলাদা করে দেখছে না; দূর থেকে যখন তারা তাকে দেখত, সেটাই তার ভাল লাগত, কাছে এলে তাদের সম্মিলিত চিৎকার তাকে পাগলপ্রায় করে দিত যখন কোনও পিতা তার সন্তানদের নিয়ে তাকে দেখতে আসতেন, তাঁর দিকে আঙুল তুলে শিশুদেরকে বর্ণনা দিতেন যে এখানে আসলে কী হচ্ছে, কতটা রোমাঞ্চকর ক্ষুধাশিল্পীর সাধনা, কতটা ত্যাগ তাকে স্বীকার করতে হয়, তখন ক্ষুধশিল্পীর খুব ভাল লাগত কিন্তু এই শিশুরা অবোধের মতই চেয়ে থাকত, স্কুলের ভেতরে কিংবা বাইরে কোথাওই তারা কিছু শেখার জন্য আসে না, তারা ক্ষুধশিল্পের কী বুঝবে? মাঝে মাঝে সে নিজেকে বলত, তার খাঁচাটা যদি পশু রাখার খাঁচাগুলোর এত কাছে না রাখা হত বোধহয় ভাল হত দর্শকেরা খুব সহজেই শিল্পী আর মাংসাশী পশুকে গুলিয়ে ফেলে; পশুগুলোর খাঁচায় পড়ে থাকা কাঁচা মাংসের তালগুলোকে ঘিরে গর্জনরত মাংসাশী জানোয়ার তাকে হতাশায় ডুবিয়ে দেয় কিন্তু সে.ম্যানেজারকে কোনও অভিযোগ করেনি; হাজার হোক, দর্শকরা যে এখানে আসে, সেজন্য সে পশুগুলোর কাছে কৃতজ্ঞ, পশু দেখতে আসা জনতার ভেতর দু'একজন হয়তো তার প্রতি আগ্রহ বোধ করবে, যারা অনুভব করবে সে মানুষ, মাংসাশী নয় 

একদিন সে আবিষ্কার করল, অস্তিত্ব থাকা অবস্থাতেই সে বিলুপ্ত হয়ে গেছে লোকেরা তার না খেয়ে থাকাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এবং তাদের কাছে এটাকে আর নতুন কিছু মনে হচ্ছে না, শিল্প মনে হওয়া তো দূরের কথা; লোকে নির্বিকারভাবে আজকাল তার খাঁচাকে পাশ কাটিয়ে যায় যেন জায়গাটা শূন্য অভুক্ত থাকাকে একটি শিল্প হিসেবে উপস্থাপন করা কঠিন, যারা বোঝে না, তাদেরকে বোঝানো যায় না তার খাঁচার সামনে সেঁটে রাখা ক্ষুধশিল্পী লেখা লেবেলটা ক্রমশ ময়লা এবং পাঠ অযোগ্য হয়ে ওঠে, একদিন সেগুলোকে ছিড়ে ফেলা হয়; যে বোর্ডটাতে তার অভূক্ত দিনের হিসাব লিখে রাখা হত এবং প্রতিদিন যত্ন সহকারে সেটা আপডেট করা হত, সেটার হিসাব একসময় একজায়গায় থমকে যায়, সার্কাসের স্টাফদের কাছে ওটা পরিবর্তন করাও অর্থহীন মনে হয়; ক্ষুধশিল্পী না খেয়ে চলে, যেমনটি সে একসময় চেয়েছিল এবং তার না খেয়ে থাকতে কোনও কষ্ট হয় না যেমন সে একসময় দাবি করত; কিন্তু কেউ আর দিন গোণে না, কেউ না, এমনকী শিল্পী নিজেও জানে না কী কী রেকর্ড সে এর মধ্যে ভেঙে ফেলেছে; তার মন ভারি হয়ে ওঠে যখন হঠাৎ কোনও অলস পথিক তার আঁচার সামনে দাঁড়িয়ে বোর্ডে লেখা পুরনো হিসাব নিয়ে ঠাট্টা করে, বলে যে এখানে মিথ্যে কথা লিখে রাখা হয়েছে, ক্ষুধশিল্পীর কাছে এটাকে সবচেয়ে হীন এবং ঘৃণ্য ঠাট্টা মনে হয়, কারণ সে কাউকে ঠকায়নি, সততার সাথে সে তার শিল্পচর্চা করে গেছে; পৃথিবী তার প্রাপ্য থেকে তাকে বঞ্চিত করেছে, ঠকিয়েছে যা হোক, আরও অনেকদিন চলে গেল, এবং সেই দিনগুলোও একদিন শেষ হয়ে এল

একদিন এক ধনী ব্যবসায়ীর চোখ পড়ল খাঁচাটির উপর এবং সে সার্কাসের কর্মীদের ডেকে জিজ্ঞেস করল, কেন এত চমৎকার খাঁচাটির ভেতর কিছু খড়কুটো রেখে অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে? কেউ কিছু বলতে পারল না কতদিন হয়েছে কে জানে, সবাই ক্ষুধশিল্পীর কথা ভুলে গিয়েছে হঠাৎ একজন ব্যক্তি মেয়াদোত্তীর্ণ নোটিশ বোর্ডটা দেখে মনে করতে পারল-হা, এখানে একজন ক্ষুধশিল্পী ছিল বটে তারা একটা লাঠি দিয়ে খড়কুটোগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করে শিল্পীকে খুঁজে পেল ক্ষুধার্ত থাকতে থাকতে শীর্ণ হতে হতে সে খড়কুটোর সাথে মিশে গিয়েছে, ওগুলোর সাথে তাকে এখন আর আলাদা করে চেনা যায় না

তুমি কি এখনও না খেয়ে আছ? ব্যবসায়ী জিজ্ঞেস করল, তুমি কি কখনোই না খেয়ে থাকা বন্ধ করবে না? আমাকে আপনারা ক্ষমা করে দেবেন। ক্ষুধশিল্পী ফিসফিস করে বলল; শুধু তার মুখের কাছে কান পেতে থাকা ধনী ব্যবসায়ী ছাড়া আর কেউ তার কথা বুঝতে পারল না 

অবশ্যই, ব্যবসায়ী বললেন এবং কর্মীদের দিকে তাকিয়ে নিজের কপালের পাশে আঙুল ছুঁইয়ে ইশারায় শিল্পীর মানসিক বৈকল্যকে ইঙ্গিত করলেন, আমরা তোমাকে ক্ষমা করছি' 

আমি সবসময় চেয়েছি আপনারা আমার ক্ষুধশিল্পকে প্রশংসা করবেন, ক্ষুধশিল্পী বলল 

আমরা প্রশংসা করছি বললেন ব্যবসায়ী

কিন্তু আপনাদের সেটা করা উচিত নয় 

কেন নয়?  

কারণ আমাকে না খেয়ে থাকতে হবে, অভুক্ত থাকা ছাড়া আমার কোনও উপায় নেই  

অদ্ভুত মানুষ তুমি! ব্যবসায়ী বিস্ময় প্রকাশ করলেন, কেন, তোমার আর কোনও উপায় নেই?  

কারণ, যে খাবার আমার প্রয়োজন, তা আমি এখনও পাইনি যদি পেতাম, বিশ্বাস করুন, সব ছেড়েছুঁড়ে আমিও আপনাদের মত হয়ে যেতাম  

এই ছিল ক্ষুধাশিল্পীর শেষ কথা, মৃত্যুর সময়ও তার আধবোজা চোখ দুটোতে অভুক্ত থাকার গর্ব লেগে ছিল, যেন বলছে, আমি পারি, আরও বহুদিন, বহু বহু দিন, অনন্তকাল আমি না খেয়ে থাকতে পারি তোমরা পারো না।।

যা হোক, এটাকে পরিষ্কার কর ব্যবসায়ী বললেন, এবং তারা ক্ষুধশিল্পীকে কবর দিল, সঙ্গে যে খড়কুটোয় সে শুয়ে থাকত, সেগুলোও খাচার ভেতর তারা একটি পূর্ণবয়স্ক চিতাবাঘ রাখল যে খাচাটা এতদিন খড়কুটোয় ভর্তি ছিল, সেখানে এই হিংস্র জানোয়ার যেন প্রাণসঞ্চার করল চিতাবাঘটি খুব ভালভাবেই বেঁচে রইল প্রতিদিনই তার পছন্দের খাবার দিয়ে তার খাঁচা ভর্তি করতে কর্মীদের কোনও ভুল হত না, একটি দিনের জন্যও তারা চিতাটিকে ভোলেনি; এমনকী চিতাটি তার স্বাধীনতাও হারায়নি; তার রাজকীয় শরীর অপরূপ রঙিন, যেন স্বাধীনতা এই শরীরকে ঘিরেই চলেছে; কখনও তার চোয়ালের ফাঁকে সে স্বাধীনতাকে বয়ে চলত; তার কণ্ঠ চিরে স্বাধীন গর্জন এমন ভাবেই বেরিয়ে আসত, দুর্বল দর্শকের জন্য সেটা সহ্য করা মুশকিল ছিল তবু দর্শক আসত, খাঁচা ঘিরে দাঁড়িয়ে মাংসাশী হিংস্র পশুটিকে দেখত, চলে যেতে চাইত না 

মূল: ফ্রানজ কাফকা অনুবাদ: অনিরুদ্ধ 

(অনুবাদকের কথা: ফ্রানজ কাফকা (১৮৮৩-১৯২৪) ছিলেন অস্ট্রিয়ান লেখক এবং ওইসব হতভাগ্য ব্যক্তির একজন, যারা সাহিত্যের জন্য আজীবন ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন, বিনিময়ে কিছু পাননি এবং জীবদ্দশায় পৃথিবী তাঁদের কোনও মূল্যায়ন করেনি। মৃত্যুর আগে তিনি অভিমান করে তাঁর বন্ধু প্রকাশক ম্যাক্স ব্রডকে বলেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর যেন তার সমস্ত সাহিত্যকর্ম পুড়িয়ে ফেলা হয়। ম্যাক্স ব্রড মুমূর্ষ বন্ধুর অনুরোধ রাখেননি। ভাগ্যিস রাখেননি, নইলে আজ পৃথিবী কাফকার সাহিত্য প্রতিভা থেকে বঞ্চিত হত এবং সাহিত্যে কাফকীয় শব্দটিরও প্রচলন হত না। তাঁর মৃত্যুর পর যখন ম্যাক্স ব্রড বন্ধুর লেখাগুলো প্রকাশের উদ্যোগ নিলেন, ফ্রানজ কাফকাকে আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা হিসেবে মেনে নিতে দ্বিধা করল না উত্তর প্রজন্ম। দ্য মেটামরফোসিস, দ্য ট্রায়াল, দ্য ক্যাস-এই উপন্যাসগুলো বাদ দিয়ে আধুনিক সাহিত্য চিন্তাই করা যায় না। আমরা অবাক হই না, যখন নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক আলবেয়্যর কামু কাফকাকে তাঁর আদর্শ হিসেবে ঘোষণা দেন; বিস্মিত হই না, আরেক নোবেল লরেট গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ যখন বলেন তাঁর সাহিত্যে জাদুবাস্তবতার প্রেরণা হলেন ফ্রানজ কাফকা। কাফকার গল্পে রহস্য আছে, আছে রোমাঞ্চ, আছে ভয় বীভৎসতা আর জাদুবাস্তবতা। তবে তিনি অন্য কোনও জগতে বা নির্জন কোনও স্থানে ভীতির সন্ধান করেননি, ভীতি আর রোমাঞ্চকে তিনি খুঁজে পেয়েছেন তার আশপাশেই, জনতার মাঝেই, এই সমাজে। মানুষই ভীতির উৎস, এই সমাজই এক বীভৎস ডিসটোপিয়া। ফ্রানজ কাফকার এ গল্পটি তার শ্রেষ্ঠ গল্পগুলোর একটি। উনবিংশ শতকে অস্ট্রিয়াতে ক্ষুধশিল্প বলে একধরনের খেলা চালু ছিল। পেশাদারভাবে কিছু লোক না খেয়ে থাকত এবং লোকে টিকিট কেটে তাদের দেখতে আসত। এই ব্যাপারটিকে প্রতীক হিসেবে নিয়ে কাফকা লিখলেন তার মডার্ন ক্লাসিক-আ হাঙ্গার আটিস্ট। একজন শিল্পী যে একাকীত্বে ভোগেন, যে ভুল বোঝাবুঝির শিকার হন, এবং এই বস্তুকেন্দ্রিক আত্মিকভাবে শূন্য সমাজ যেভাবে একজন শিল্পীকে দুরে ছুঁড়ে দেয়, শিল্পীর যে ট্র্যাজেডি, সেটাই উঠে এসেছে এই গল্পে। সমাজ বস্তুগত-মোটাদাগের আনন্দ চায়, শিল্পের মত আত্মিক উন্নতির চর্চা সমাজে গৃহীত হয় খুব কম।

আজীবন আত্মিক দ্বন্দ্বে ভুগেছেন কাফকা, অফিসের যান্ত্রিকতা আর সাহিত্য জগতের সৃষ্টিশীলতা-এই দ্বৈত জীবনের টানাপোড়েন  আর শিল্পীর একাকীত্ব তাকে ভেতরে ভেতরে ক্ষয় করে। সারাদিন ইনস্যুরেন্স অফিসে হাড়ভাঙা চাকরি আর রাত জেগে লেখালেখি তার আয়ু কমিয়ে দেয়। চল্লিশ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে তিনি মারা যান।

No comments:

Post a Comment

Popular Posts