মজার গল্প, উপন্যাস, গোয়েন্দা কাহিনী, ছোট গল্প, শিক্ষামূলক ঘটনা, মজার মজার কৌতুক, অনুবাদ গল্প, বই রিভিউ, বই ডাউনলোড, দুঃসাহসিক অভিযান, অতিপ্রাকৃত ঘটনা, রুপকথা, মিনি গল্প, রহস্য গল্প, লোমহর্ষক গল্প, লোককাহিনী, উপকথা, স্মৃতিকথা, রম্য গল্প, জীবনের গল্প, শিকারের গল্প, ঐতিহাসিক গল্প, অনুপ্রেরণামূলক গল্প, কাহিনী সংক্ষেপ।

Sunday, August 30, 2020

ছোট গল্প – গিম্পেল দ্যা ফুল – আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার – বাংলা অনুবাদ - Short Story - Gimpel the Fool - Isaac Bashevis Singer – Bengali Translation

ছোট গল্প – গিম্পেল দ্যা ফুল – আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার  – বাংলা অনুবাদ - Short Story - Gimpel the Fool - Isaac Bashevis Singer – Bengali Translation


ছোট গল্পগিম্পেল দ্যা ফুলআইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার  বাংলা অনুবাদ - Short Story - Gimpel the Fool - Isaac Bashevis Singer – Bengali Translation

আমি হাবা গিম্পেল। যদিও লোকজন আমাকে এ নামেই ডাকে, কিন্তু নিজেকে আমি হাবা মনে করি না। স্কুলে থাকার সময়ই আমার এ নাম দেয়া হয়। আমার সব মিলিয়ে সাতটি নাম ছিল। হাঁদা, গাধা, ভোতা বুদ্ধি, ভ্যানদা, বেকুব, মূর্খ আর হাবা। এর মধ্যে এই শেষ নামটা হিট করে ফেলল। শুনতে চান আমার বোকামির ধরন?
আমাকে ধোঁকা দেয়া খুব সহজ। একদিন সবাই এসে আমাকে ঘিরে ধরে বলল, গিম্পেল, যাজক সাহেবের বউ এর বাচ্চা হবে, তুই জানিস না?
ছি ছি! কাজেই আমি স্কুল বাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি তাকে দেখতে গেলাম। আসলে সব ছিল মিথ্যে কথা। কিন্তু আমি কেমন করে জানব সে-কথা? না হয় তার পেট উঁচু হয়নি। কিন্তু আমি কখনও কোন মহিলার পেটের দিকে তাকাই না।
এটা কি এমন কোন বোকামি? আমার পেছনে তখন সারা শহরের সব লোক। কেউ গাধার ডাক দিচ্ছে, কেউ জোরে জোরে নেচে হাততালি দিয়ে গান গাইছে। একজন আমার হাতে কালো একটা কী দিয়ে ভর্তি করে দিল। প্রথমে ভাবলাম কিশমিশ। ভাল করে তাকিয়ে দেখি আসলে ছাগলের নাদি। আমি দুর্বল নই। আমার গায়ে অনেক জোর। এদের কাউকে একটা চড় দিলে সে কোন জায়গায় চলে যেত, তার ঠিক নেই। কিন্তু আমার
সমস্যা হচ্ছে, আমি কারও উপর রাগ করতে পারি না।
আরেকদিন আমি স্কুল থেকে ফিরছি। এমন সময় শুনি কুকুরের ডাক। কুকুর আমি ভয় পাই না ঠিকই, কিন্তু সেধে তো আর কুকুরের সামনে গিয়ে পড়তে পারি না। তা ছাড়া, কুকুরটা পাগলাও তো হতে পারে? আর ওটা যদি আমাকে কামড়ায়, তবে আমি খুব ভাল করেই জানি, এ পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে আমার মত একটা বোকার সাহায্যে এগিয়ে আসবে। সুতরাং গিম্পেল, তুমি জান নিয়ে পালাও! পালানোর চেষ্টা করতেই দেখি পুরো বাজার হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ছে। আদতে কোন কুকুরই ছিল না। এই এলাকার ছিচকে চোর উলফ-লিবের নকল ডাক দিয়েছিল। কিন্তু আমি কী করে তা জানব! অবিকল একটা মাদী কুকুরের মতই ছিল সেই ঘেউ-ঘেউ।
এই ধোকাবাজের দল বুঝে গেল আমাকে বোকা বানানো কত সহজ। প্রত্যেকেই আমার মাধ্যমে তার ভাগ্যটা একবার যাচাই করে দেখত, যদি আমাকে বোকা বানানো যায়। তাদের কথাবার্তার উদাহরণ দিইঃ  
গিম্পেল, শোনো আজ বিকেলে জার ফ্রাম্পোলে আসবেন।
এই যে গিম্পেল, টারবিনে না আজ চাঁদ আকাশ থেকে একেবারে মাটিতে নেমে এসেছে।
গিম্পেল, দাঁড়া, শুনে যা একটু, আজকে হয়েছে কী, ওই যে হোদেলকে চিনিস না, সে বাড়ির পেছনে গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছে। 
আমাদের ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে, এ পৃথিবীতে সবই সম্ভব। প্রথম প্রথম তাই আমি তাদের সব কথা বিশ্বাস করতাম, আর মনে বারবার প্রশ্ন জাগত, -ও সম্ভব তা হলে? আসলে সবাই যখন এক হয়ে একই কথা বলতে শুরু করে, তাদের অবিশ্বাস করি কীভাবে? কখনও যদি বলতাম, না, তোমরা আমার সাথে ফাজলামো করছ, তখন তারা ভীষণ ক্ষেপে উঠত। তার মানে তুই বলতে চাচ্ছিস, আমরা মিথ্যুক?
এরপর আমি আর কী করতে পারি? আমি তাদের প্রতিটি কথায় বিশ্বাস করা শুরু করলাম, তবু যদি একটু সদয় আচরণ পাওয়া যায়!
আমার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। ছোটবেলায় দাদার কাছে বড় হয়েছি। অনেকদিন হলো তিনিও কবরে সেঁধিয়েছেন। ফলে আমাকে একটা বেকারিতে কাজ নিতে হলো এখানেও লোকজন আমাকে নিয়ে কী না করেছে। যে-ই আসত, আমাকে নিয়ে মস্করা না করে পারত না।
গিম্পেল, যাজক সাহেব সাত মাসের মাথায় একটা বাদুড়ের বাবা হয়েছে।  
ও তুমিই গিম্পেল, তোমার নাম অনেক শুনেছি। জানো নাকি, এইমাত্র একটা গরু উড়ে উড়ে ছাদে এসে ওখানে পিতলের ডিম পাড়ছে, গিয়ে দেখে আসো একবার।
একবার এক ছাত্র রোল কিনতে এসে আমাকে বলে, গিম্পেল, তোমার খুচুনি পরিষ্কার করার শব্দে মেসিয়াহ চলে এসেছে। সব মড়া কবর থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে আবার। শুনতে পাচ্ছ না ওদের শব্দ?  
কী যা তা বলছ, কই, আমি তো কিছু শুনছি না।
আমার এ কথা শুনেই সে বলে, তুই কি কানে শুনিস না?
আশপাশের সবাই এ কথায় মজা পেয়ে নাকি সুরে কাঁদা শুরু করল। এদের মধ্যে একজন কান্না থামিয়ে বলে, গিম্পেল, তোর বাবা-মাকে কবরস্থানে দেখলাম। তারা হন্যে হয়ে তোকে খুঁজছে।  
সত্যি বলতে কী, আমি খুব ভাল করেই জানি আসলে কী ঘটছে, কিন্তু ওই যে বললাম, আমার লোকজনকে অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না? সত্যি কিছু হলেও তো হতে পারে, এই ভেবে গায়ের জ্যাকেট ছুঁড়ে ফেলে আমি বাইরে দৌড়ে গেলাম। শুধু একটা বিড়াল, আর তার ডাক সেখানে। আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, আর কোনদিন কোনকিছু বিশ্বাস করব না। কিন্তু এ-শপথ বেশি দিন টিকল না, তারা সবাই মিলে এমনভাবে আমাকে ধোঁকা দিতে থাকল যে, আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো এমন সব সিরিয়াস ব্যাপার নিয়ে কেউ এরকম ঠাট্টা-তামাশা করতে পারে।
আমি পুরোহিত সাহেবের কাছে গেলাম কিছু পরামর্শ যদি পাওয়া যায়, এই আশাতে। তিনি শান্ত গলায় বললেন, তোমার সারাদিনের বোকামিও ওদের একঘণ্টার শয়তানির চেয়ে ভাল। আসলে তারাই সত্যিকারের বুদ্ধিহীন। যে তোমার মত একজনকে লজ্জায় ফেলে, সে খোদ বেহেশতটাকেই হাত থেকে ফেলে দেয়।
আমার মন ভাল হয়ে গেল, তার বাড়ি থেকে বেরুচ্ছি, এমন সময় তার মেয়ে এসে গম্ভীর গলায় বলল, গিম্পেল, তুমি কি বাড়ির দেয়ালে এখনও চুমু খাওনি?
আমি বিব্রত গলায় বললাম, না তো! কেন?
জানো না, এটাই নিয়ম, রাব্বির বাড়ি থেকে চলে যাবার সময় দেয়ালে ঠোট ছোয়াতে হয়।  
আমি দেয়ালে চুমু খেতেই সে খিকখিক করে হাসতে শুরু করল। আবার একজন আমাকে একহাত দেখে নিল। কী আর করা!
বাধ্য হয়ে আমি অন্য শহরে চলে যেতে চাইলাম, কিন্তু তখনই হঠাৎ সবাই আমাকে বিয়ে করানোর ব্যাপারে ব্যস্ত হয়ে উঠল। যতক্ষণ তাদের কথায় রাজি না হলাম, তারা আমার পিছু ছাড়ল না। যার সাথে তারা আমার বিয়ে ঠিক করল, বাজারে তাকে নিয়ে অনেক রটনা ছিল। কিন্তু তারা তাকে সতী-সাধ্বী বলে দাবী করল। আমি জানতাম, সেই মহিলার একটা জারজ সন্তান আছে, কিন্তু সবাই বলল আসলে নাকি সেই ছেলেটা তার ছোট ভাই। আমি এদের সবাইকে বোঝানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে বললাম, কেন মিছেমিছি সময় নষ্ট করছ। মরে গেলেও আমি এই বেশ্যাকে বিয়ে করতে পারব না।
আমার এই সত্যভাষণ শুনে তারা যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়ল। তারা রুষ্ট স্বরে বলল, এ কী ধরনের কথা? আয়নায় নিজেকে দেখেছিস. কখনও? নিজেকে দেখে তোর লজ্জা করে না? দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজা। একটা ভাল মেয়ের নামে এসব কথা বলছিস! রাব্বি সাহেবকে বলছি সব।
জরিমানার ভয় দেখিয়ে তারা আবার আমাকে কৌতুকের পাত্রে পরিণত করল। আমি অনেক কষ্টে আবার নিজেকে বোঝালাম, বিয়ের পর তুমি যখন ওই মেয়ের স্বামী হবে, তখন নিশ্চয়ই সে তোমার কথা শুনবে। আর, কারও জীবনই তো পরিপূর্ণ প্রাপ্তিময় নয়, কারও তেমনটা আশা করাও উচিত নয়।
সুতরাং আমি একদিন পায়ে পায়ে তার বাড়িতে হাজির হলাম। পেছনে আবার সেই অসংখ্য লোকজন। এই মেয়ের নাম এলকা। সে বাড়িতে এমনই এক উগ্র পোশাকে বসে ছিল যে, আশপাশের সবার চোখ চকচক করে উঠল। কিন্তু কেউ তার সাথে কথা বলবার সাহস পেল না। কারণ একবার এলকার মুখ ছুটলে কী বলে বসে কে জানে! আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
এলকাও এই হাবা গিম্পেলকে চিনত। সে ব্যস্ত হবার ভান করে বলল, দেখো দেখো কে এসেছে। কী সৌভাগ্য আমার ওকে বসতে দাও।
আমি তাকে সব খুলে বললাম। দেখো, আমাকে মিথ্যা বোলো না। আসলেই কি তুমি এর আগে কারও সাথে শোওনি? এই ছেলেটি কি সত্যি তোমার ছোট ভাই? দয়া করে আমাকে ধোকা দিয়ো না। আমার বাবা-মা কেউ নেই যে আমাকে পরামর্শ দেবে।
এলকা আস্তে আস্তে বলে, দেখো, আমারও বাবা-মা কেউ নেই...
সুতরাং বিয়ে হয়ে গেল। রাব্বি অবাক হয়ে বলল, আরে, এই মেয়ে? এ কি বিধবা, না একে তালাক দেয়া হয়েছে?
হাসতে হাসতে একজন মহিলা বলে, দুটোই।
দুঃখে আমার চোখে পানি এসে পড়ল। অথচ আমি কী করতে পারতাম? দৌড়ে পালিয়ে চলে এলে খুব ভাল হত?
চারদিকে নাচ-গান চলছে। ছোট ছোট উপহার জমা হতে থাকল টেবিলে, হঠাৎ দেখি দুজন দারুণ সুন্দর লোক বাচ্চাদের একটা দোলনা টেবিলে রাখছে। আমার বুক ধক করে উঠল। এগুলো আমাদের কী দরকার? আমি প্রশ্ন করলাম। লোক দুজন বাঁকা হাসি দিয়ে বলল, গিম্পেল, তোমার এ-ব্যাপারে মাথা ঘামাবার কোন দরকার নেই। সব এলকা বুঝবে।
আমার মনে হতে থাকল, আবার আমি প্রতারিত হচ্ছি। কিন্তু আমার আর হারাবার কী-ই বা আছে? দেখাই যাক না, ভাগ্য কতটা খারাপ হতে পারে।

দুই
রাতের বেলা আমি তার বিছানায় যেতেই সে বলল, উঁহু, আজ না আমার মাসিক চলছে।
আমি আঁতকে উঠে বললাম, গতকাল না তোমাকে বিয়ে উপলক্ষ্যে গোসল করতে হলো!
বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে সে খনেখনে গলায় বলল, গতকাল আর আজ এক হলো নাকি? তোমার যদি ভাল না লাগে, তা হলে চুপচাপ বসে থাক।
অতএব, আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম তো করতেই থাকলাম।
বিয়ের চারমাসও যায়নি, এমন সময় এলকার প্রসব বেদনা উঠল। সারা শহরের লোক মুখ টিপে হাসি চালাচালি করতে থাকল। কিন্তু আমি কী করব?
এদিকে আবার আমার স্ত্রী অসহ্য ব্যথায় নীল হয়ে গিয়েছে। চাপা গোঙানির মত স্বরে সে বলল, গিম্পেল। আমি মরে যাচ্ছি, গিম্পেল, আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো
সারা বাড়িতে এলাকার মহিলাদের আনাগোনা পড়ে গেল। কেউ পানি গরম করছে, কেউ চিষ্কার করছে।
আমার এ-অবস্থায় করার মত একটাই কাজ ছিল, আমি তা ই শুরু করলাম, প্রাণপণে প্রার্থনা করতে থাকলাম।
এক কোনায় দাড়িয়ে আমি প্রার্থনা করছি, আর আশপাশের লোকজন সমানে টিপ্পনি কাটছে।
দোয়া করো, গিম্পেল, দোয়া করো তবে মনে রেখো, দোয়া করে কাউকে তুমি গর্ভবতী করতে পারবে না কখনও।  
এদের একজন আমার মুখে একটা খড় ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, গরুর জন্য সামান্য খড় দিলাম।
ঈশ্বর! এমন নিষ্ঠুর লোকও পৃথিবীতে আছে তা হলে?
এলকা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিল। গির্জার খাদেম সমবেত সকলের উদ্দেশে বলল, এ উপলক্ষ্যে গিম্পেল সবার জন্য একটা ভোজের আয়োজন করবে।
হাসতে হাসতে তখন একেকজনের পেটে খিল ধরে যায় আর কী! যেহেতু আমার অন্য কোন উপায় নেই, তাই সবাইকে খাওয়াতে হলো, তারপর এ শিশুর নাম আমার পিতার নামে রাখলাম। আমার বাবা স্বর্গে শান্তিতে বাস করুন
রাতে আমার স্ত্রী আমাকে বলল, গিম্পেল, চুপচাপ বসে আছ যে, কী হয়েছে তোমার?'
আমি কী বলব? তবু বললাম, খুব দারুণ একটা কাজ তুমি আমার জন্য করেছ, আমার মা ব্যাপারটা জানলে আবার মরা পড়তেন। এবার লজ্জায়।
এলকা দৃঢ় স্বরে বলল, কী পাগলের মত যা তা বলছ? তুমি কী ভাবছ, বলো তো?
আমি দেখলাম আমার সরাসরি কথা বলাই উচিত। বললাম, আমার মত অনাথকে তুমি এভাবে ব্যবহার করতে পারলে? তুমি আগাগোড়া এক জারজ সন্তানের জন্ম দিয়েছ।
সে তীব্র স্বরে বলল, এসব পাগলামি মাথা থেকে সরাও। সে অবশ্যই তোমার ছেলে।
সে কীভাবে আমার হবে? আমি যুক্তি দেবার চেষ্টা করলাম। আমাদের বিয়ের সতেরো সপ্তাহ পরেই সে জন্ম নিয়েছে।  
আমার স্ত্রী শিশুটিকে সময়ের আগেই অপরিপক্ক অবস্থায় জন্ম নিয়েছে বলে দাবী করল। বলল, তার কোন এক দাদীমারও নাকি এরকম ঘটেছিল। সে এমন জোর গলায় কথা বলল, যে-কেউ তাতে বিশ্বাস করবে। কিন্তু আমি এক বর্ণও বিশ্বাস করলাম না
পরদিন স্কুলের এক শিক্ষককে ব্যাপারটা বলাতে তিনি বললেন, ধর্মগ্রন্থে নাকি এরকম উদাহরণ আছে। হায়, সারা পৃথিবীতে কে আমার কষ্ট বুঝবে?
কাজেই আমি আমার দুঃখ ভুলে যাবার চেষ্টা করলাম শিশুটিকে আমি পাগলের মত ভালবেসে ফেললাম শিশুটিও আমাকে একইরকম ভালবাসা ফিরিয়ে দিল। আমাকে দেখামাত্রই সে কোলে ওঠার জন্য হাত বাড়িয়ে দিত, যখন সে কান্নাকাটি শুরু করত, তখন আমি ছাড়া কেউ তাকে শান্ত করতে পারত না। বাচ্চার উপর শয়তানের নজর কাটানোর জন্য আমি ঈশ্বরের কাছে দোয়া করি, যেন অশুভ সবসময় আমার সোনামণির কাছ থেকে দূরে থাকে। আমি তখন সারাদিন গরুর মত খাটতে শুরু করলাম। বাড়িতে একটা শিশু এলে কী পরিমাণ খরচ বাড়ে, তা তো আপনাদের জানাই আছে। আরেকটা সত্যি কথা বলি, এতকিছুর পরও আমি এলকাকে ভালবাসতাম। আর এলকা এদিকে সারাদিন আমাকে অভিশাপ দিত। তার চিৎকার, গালাগালি সহ্য করে, এমন ক্ষমতা কার আছে?
প্রতিদিন সন্ধ্যায় আমি তার জন্য বেকারি থেকে কিছু না কিছু এনে দিতাম। কোনদিন রুটি, কখনও পনির, মুরগির মাংস-এসব। আমার মনে হত, আমার ক্ষমা পাওয়া উচিত। এলকা এগুলো খেয়ে খেয়ে মোটা হতে লাগল, তার চেহারাও ফিরে আসতে শুরু করল।
রাতে আমাকে বেকারিতে থাকতে হতো কেবল শুক্রবার রাত আমি বাড়িতে কাটানোর অনুমতি পেতাম। এই একরাতও সে আমাকে কাছে ঘেঁষতে দিত না। সবসময় তার একটা না একটা সমস্যা। কোনদিন বুক জ্বালাপোড়া, শরীরে কোনও সময় চিনচিনে ব্যথা, আবার কখনও মাথাব্যথা। আপনারা তো
জানেনই, এসব ক্ষেত্রে মেয়েদের কতরকম অজুহাত থাকতে পারে। ফলে এই একটা দিনেও তিক্ত সময় কাটাতে হতো আমাকে। এদিকে তার ভাই, সেই জারজটা, দিনে দিনে তাগড়া হলো মাঝে মাঝেই সে আমাকে ঢিল ছুঁড়ত, আমি পাল্টা ঢিল ছুঁড়তে গেলেই এলকার মুখের তুবড়ি শুরু হয়ে যেত। চোখের সামনে আমি সারাক্ষণ অন্ধকার দেখতে লাগলাম। দিনে দশবার সে আমাকে তালাকের হুমকি দিতে শুরু করল। আমার জায়গায় অন্য যে-কোন পুরুষ সব কিছু চুকিয়ে অনেক আগেই বিদায় নিত। কিন্তু আমার জন্মই হয়েছে চুপচাপ সব কিছু মেনে নেয়ার জন্যে। ঈশ্বর অনেক সমস্যা দিয়েছেন, আবার তা সহ্য করবার জন্য শক্তিও দিয়েছেন।
একদিন রাতে বেকারিতে আগুন ধরে গেল। বাড়িতে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না, কাজেই আমি বাড়ি রওনা হলাম। তা ছাড়া, সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে নিজের ঘরে ঘুমানোর একটা সুযোগও হয়ে গেল এতে। আমি কাউকে না জানিয়ে আস্তে দরজা খুললাম। কিন্তু আমার মনে হলো, বিছানায় দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ। একটা মদু ধরনের, আরেকটা বুনো ষাড়ের মতন। আমি সম্মোহিতের মত বিছানার পাশে যেতেই সারা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেল। এলকার পাশে আরেকটা লোক শুয়ে আছে। আমার বদলে অন্য কেউ হলে এক চিঙ্কার দিয়ে সারা শহর জাগিয়ে তুলত। কিন্তু সাথে সাথে আমার মাথায় আরেকটা চিন্তা এল। বিছানার পাশে আমাদের ছোট বাচ্চাটা ঘুমিয়ে আছে।
সারা শহর জেগে উঠলে সে-ও জেগে উঠবে। তার তো কোন দোষ নেই, শুধু শুধু সে ঘুম থেকে উঠে ভয় পাবে। ফলে আবার আমি ফিরে গেলাম। সকাল পর্যন্ত আমি দুচোখের পাতা এক করতে পারলাম না। ম্যালেরিয়া রোগীর মত কাঁপতে কাঁপতে আমার মনে হলো, মানুষজন আমাকে আর কত চুষে চুষে খাবে। গাধামির তো একটা সীমা থাকা উচিত, নাকি?
সকালে আমি গির্জার পুরোহিতের কাছে গিয়ে সব খুলে বললাম। সারা শহরে একটা হৈ-চৈ লেগে গেল, লোক পাঠিয়ে এলকাকে নিয়ে আসা হলো এসেই সবকিছু অস্বীকার করল সে, চিল্কার করে বলতে লাগল, এই হাবাটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সব মিথ্যা, সব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।
এলকা চলে যেতে আমি পুরোহিতকে জিজ্ঞেস করলাম আমার কী করা উচিত। তিনি কালবিলম্ব না করে আমাকে বললেন বিচেছদ ঘটানোর জন্য।
তা হলে এই শিশুটির কী হবে? আমি জিজ্ঞেস করলাম। আগে ওই বেশ্যাকে বের করে দাও। তা হলে এই জারজটাও তার সাথেই চলে যাবে।  
এই রায়ে আমার মাথায় ঝিম ধরে গেল, এলকার অসহ্য চেঁচামেচি, অভিশাপও মনে হয় অনেক ভাল ছিল। আমি ভাবার জন্য খানিকটা সময় নিয়ে চলে এলাম।
দিনের বেলা আমার কোন সমস্যা হয় না। আমার মনে হয়, যা হবার তা তো হবেই। কোনও ব্যাপার না। কিন্তু রাত নামতেই আমার নিজস্ব পৃথিবী এলোমেলো হয়ে যায়। শিশুটার জন্য আর তার মার জন্য আমার অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করে। মাঝে মাঝে মনে হয়, এলকার উপর আমার ভীষণ রাগ করা উচিত। কিন্তু ওই যে আমার দুর্ভাগ্য, আমি কারও উপর ক্রুদ্ধ হতে পারি না
সারাক্ষণই একা একা ভাবতে থাকলাম, ভুল তো মানুষেরই হয়। নিজেকে বোঝালাম, সম্ভবত যে-লোকটা এলকার সাথে শুয়েছিল, সে-ই এলকাকে এর জন্য প্রলুব্ধ করেছে। আর এটা তো জানা কথাই, যেহেতু মেয়েদের চুল লম্বা, সেহেতু তাদের বুদ্ধি খাটো। ফলে ওই লোক এলকাকে ভুংভাং দিয়ে এলকার পাশে শুয়েছে। আবার কখনও বা ভাবলাম, এলকা তো পুরো ব্যাপারটা অস্বীকার করেছে, তা হলে মনে হয় আমিই ভুল দেখেছি। হ্যালুসিনেশন তো ঘটতেই পারে। দূর থেকে একটা মূর্তি দেখা যেতে পারে ঠিকই, কিন্তু কাছে গেলেই তো সে মিলিয়ে যেতে পারে। যদি তা ই হয়? এলকার প্রতি আমি অবিচার করছি। এটা ভাবতেই আমার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠল। আমি যে ময়দার বস্তার উপর ঘুমাতাম, তা আমার চোখের জলে ভিজে গেল। সকালে আমি পুরোহিতের কাছে গিয়ে জানালাম, আমার তথ্যে ভুল ছিল। সম্ভাবনাগুলো আমি তাকে খুলে বললাম, তিনি বিষয়টা বিবেচনার আশ্বাস দিলেন। যতদিন কোন সিদ্ধান্ত না হয়, ততদিন আমি আমার স্ত্রীর সাথে দেখা করতে পারব না, কিন্তু লোক মারফত তার কাছে খাবার-দাবার ও টাকা-পয়সা পাঠানোর সুযোগ পেলাম আমি।

তিন
নয় মাস চলে গেল, অথচ গির্জা কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারল না আমার বিষয়ে। আমি বুঝি না এত কী ঝামেলা আছে এই ছোট্ট ব্যাপারে। এর মাঝে এলকার আবার একটা বাচ্চা হলো সাবাথের দিনে (শনিবারের প্রার্থনার দিন) আমি সিনাগগ গিয়ে তার জন্য দোয়া করে এলাম। মেয়ের নাম রাখলাম আমার শাশুড়ির নামে। ঈশ্বর আমার শাশুড়িকে শান্তিতে রাখুন। এদিকে আমার দুঃখে সারা ফ্রাপোল খুশিতে আটখানা। কিন্তু এলকা সম্বন্ধে আমার বিশ্বাস থেকে আমি একচুল নড়লাম না। আজকে যদি আমি আমার স্ত্রীকে অবিশ্বাস করি, তা হলে দেখা যাবে আগামীকাল থেকে ঈশ্বরকেই আমি অবিশ্বাস করতে শুরু করেছি। এলকার বাড়ির পাশেই থাকে, এমন একজন লোক দিয়ে প্রতিদিনই আমার সাধ্যমত খাবার-দাবার পাঠাই এলকাকে। রুটি, কেক, রোল, সুযোগ পেলে পুডিং, পিঠা এ-ধরনের জিনিসপত্র। লোকটা নিজেও খুব বড় হৃদয়ের ছিল, সে-ও মাঝে মাঝেই এসবের সাথে নিজে থেকে কিছু খাবার-দাবার যোগ করত। অবশ্য এই লোক আগে আমাকে নানাভাবে জ্বালাতন করত। কখনও নাক মলে দিত, কখনও পেটে খোঁচা দিয়ে বসত। অবশ্য আমাদের বাসায় যাওয়ার পর থেকে সে আমার ওপর যথেষ্ট সদয়। একদিন সে আন্তরিক গলায় বলল, গিম্পেল, তোমার ঘরে এক অসাধারণ স্ত্রী আর দুটো ছোট বাচ্চা। তুমি তো না চাইতেই অনেক কিছু পেয়ে গেছ, তুমি এতসবের যোগ্য নও।
আমি দারুণ খুশি হয়ে বললাম, অথচ দেখো, শহরের লোকজন এলকাকেই বরং এসব কথা বলে।
যতসব বড় বড় কথা। এত আগড়ম-বাগড়ম শোনা অর্থহীন। ওদের কথায় কান না দিলেই হলো একদিন পুরোহিত আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, তুমি কি নিশ্চিত, তুমি তোমার স্ত্রী সম্পর্কে ভুল করেছিলে?  
আমি নিশ্চিত, শান্ত স্বরে বললাম।
কিন্তু তুমি তো একটা কিছু দেখেছ সেখানে, তা-ই না? তা হলে সেটা কী?
মনে হয় একটা ছায়া। কীসের ছায়া?  
আমি বললাম, ছাদের কড়িকাঠের ছায়া, বিছানার উপর পড়েছিল।  
এরপর তিনি ধর্মগ্রন্থ ঘেঁটে আমাকে আমার স্ত্রীর সাথে থাকার অনুমতি দিলেন। আবার আমার সবকিছু ভাল লাগতে শুরু করল। স্ত্রী আর শিশুদের ছেড়ে দূরে থাকা খুব কঠিন ব্যাপার। সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যার পর বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম। কিছু রুটি আর কেক নিলাম সাথে করে। আকাশে স্নিন্ধ জ্যোৎস্না, অসংখ্য তারায় ঝকঝক করছে আকাশ। তখন হালকা শীতের সময়, পেঁজা তুলোর মত তুষার পড়ছে এখন-তখন। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল গান গাইতে, কিন্তু রাত বেশি হওয়ায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে মনে করে গান গাইলাম না। অন্তত আপনমনে শিস বাজাতে মন চাইছিল আমার, কিন্তু শিসের শব্দে আবার রাতের বেলা প্রেতাত্মারা হাজির হয়, কাজেই তা-ও বাদ।।
বাড়িতে ঢুকতে আমার বুক আনন্দে নাচতে শুরু করল। ঘরের ভেতর সবাই ঘুমুচ্ছে। আমার চোখ পড়ল দোলনার দিকে। চাঁদের আলো জানালার ফাঁক গলে এসে পড়েছে ছোট শিশুটির মুখে। প্রথমবার তার মুখ দেখেই আমি তাকে ভালবেসে ফেললাম।
আমার বিছানার পাশে যেতেই আবার আমার সারা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে এল। সেই লোকটা, যে আমার কাছ থেকে খাবার দাবার নিয়ে বাড়িতে আসত, সে এলকার পাশে শুয়ে। চারদিকে এত চাঁদের আলো কিন্তু আমি অন্ধকার একটা ছায়া ছাড়া কিছু দেখছি না। আমার সারা শরীরে কাঁপুনি উঠে গেল। আমার হাত থেকে রুটি মাটিতে পড়ে যাবার শব্দে এলকা ঘুমজড়িত কণ্ঠে বলল, কে ওখানে, কে?
আমি, গিম্পেল।  
তুমি এখানে কেন। লোকে কী বলবে?  
আমি চাপা স্বরে কাঁপতে কাঁপতে বললাম, পুরোহিতই আসতে বলেছে।
এলকা বলল, গিম্পেল, শোনো একটু খোঁয়াড়ে যাও। আমাদের ছাগলটা অসুস্থ।
আগে বলা হয়নি, আমাদের একটা ছাগল আছে। একটা ছোট্ট প্রাণী, কিন্তু এই জীবটাকে আমি প্রায় মানুষের মতই ভালবাসি। দ্রুত খেয়াড়ে গিয়ে ছাগলকে ভাল ভাবে দেখলাম। কোনও অস্বাভাবিকতা খুঁজে পেলাম না। মনে হলো ও ঠিকই আছে। আমি ওকে বললাম, ভাল থাকিসরে, বাছা এই ছোট্ট জীবটা শুভেচ্ছার প্রতিউত্তরে মনে হয় আমার মঙ্গল কামনা করেই বলল, ব্যা...'
আমি ঘরে ফিরে এলাম। ততক্ষণে সেই লোকটা উধাও। জিজ্ঞেস করলাম, সেই লোকটা কোথায়?
কোথায় কোন লোকটা?
যে তোমার পাশে শুয়েছিল।  
এলকা আকাশ থেকে পড়ার ভান করল। তারপর শুরু হলো তার চিঙ্কার। শয়তান, ইতর, বাঁদর, শুয়োর এমন কোনও শব্দ নেই যা সে উচ্চারণ করল না। সারা শহর বিছানা থেকে উঠে এল সেই শব্দে।
আমি নড়ার আগেই তার সেই ভাইটা আমার মাথার পেছন দিকে ভয়ানক এক ঘুসি চালাল। আমার মনে হলো সারা মাথা যেন ছিড়ে পড়ে গিয়েছে সে আঘাতে। এদিকে মনে হচ্ছে সারা শহর আমাকে পিশাচ ভাবা শুরু করে দিয়েছে। অনেক কষ্টে আমি এলকার চিৎকার থামালাম।
পরদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম সেই লোককে, সে এমনভাবে আমার দিকে তাকাল, যেন আমি অন্য গ্রহের জীব। সে বলল, আপনার মাথা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে, আপনি দ্রুত ডাক্তার বা কবিরাজ দেখান।  
পাঠক, একটা বিশাল গল্পকে খুব সংক্ষেপে বলে ফেলি। বিশ বছর আমি আমার স্ত্রীর সাথে কাটাই, আমাদের ছয়টি সন্তান হয়। চারটি মেয়ে, দুটি ছেলে। বলতে গেলে সব ধরনের ঘটনাই ঘটল, কিন্তু আমি দেখেও না দেখার, শুনেও না শোনার ভান করে থাকলাম। আমার কেবলই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হত সবাইকে। সেদিন পুরোহিত বললেন, জীবনে বিশ্বাসই আসল। একজন সৎ লোক সবসময় নিজের বিশ্বাস নিয়েই বেঁচে থাকে।
হঠাৎ একদিন আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ল। তার বুকে ছোট একটা টিউমারের মত হলো একের পর এক বৈদ্য, চিকিৎসক এলো বলার মত কিছু নয়, তাই বলা হয়নি, এখন আমার নিজের একটি বেকারি আছে, এবং আমাকে এখন মোটামুটি বিত্তশালী বলা চলে। ডাক্তার-কবিরাজের যা সাধ্যে ছিল, তার সবই তারা করল। এমনকী লাবলিন থেকে একজন বড় ডাক্তারও এলেন, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। মারা যাবার আগে আমাকে বিছানার কাছে ডেকে নিয়ে গিয়ে এলকা বলল, আমাকে মাফ করে দিয়ো, গিম্পেল।।
আমার মন দারুণ খারাপ হয়ে গেল, আমি ভারাক্রান্ত গলায় বললাম, ক্ষমা করার কী আছে। তোমার মত ভাল আর বিশ্বস্ত স্ত্রী তো খুব বেশি নেই।
না, গিম্পেল, না। এতগুলো বছর ধরে আমি তোমার সাথে প্রতারণা করে আসছি। সৃষ্টিকর্তার কাছে যাচ্ছি আমার কি হবে জানি না। তোমাকে বলছি, শোনো, এই বাচ্চাদের কোনটাই তোমার নয়।  
সত্যি বলছি, কেউ একজন যদি একটা বড় কাঠের টুকরো দিয়ে আমার মাথায় বাড়ি বসাত, তবুও আমি এত দুঃখ পেতাম না, এই কথাটায় যত দুঃখ পেলাম। আমি আস্তে আস্তে বললাম, ওরা তা হলে কাদের?
আমি জানি না। এত লোক আমার সাথে... কিন্তু ওরা তোমার নয়।
বলতে বলতেই এলকার মাথা একদিকে হেলে পড়ল, চোখ ঘোলা হয়ে এলো একসময় সব শেষ হয়ে গেল
মরে যাওয়ায় কথা শেষ করতে পারেনি, কিন্তু আমার মনে হলো, সে বলছে, আমি গিম্পেলকে ঠকিয়েছি। সারা জীবন ধরেই ঠকিয়েছি।

চার
এক রাতে, আমি ময়দার বস্তার উপর ঘুমিয়ে আছি, এমন সময় স্বপ্নে শয়তানের ছায়ামূর্তি এসে হাজির। সে বলল, গিম্পেল, তুই ঘুমিয়ে আছিস কেন?
আমি বললাম, তা হলে কী করব? ঘোড়ার ঘাস কাটব?
সারা পৃথিবী তোকে ঠকিয়েছে, এখন তোর প্রতিশোধ নেবার পালা।
আমি একা কীভাবে সারা পৃথিবীর উপর প্রতিশোধ নেব?  
সারাদিন তুই মানুষের প্রস্রাব যোগাড় করে একটা বালতি ভর্তি করে রাতে ময়দার সাথে ওটা মিশিয়ে দিবি। সারা ফ্রাম্পোলকে তা হলে পেশাব খাওয়ানো হয়ে গেল।
এরপর শয়তান উধাও হয়ে গেল। শয়তান চলে যেতেই প্রকৃতির ডাকে আমার ঘুম ভাঙল। পাশেই দেখি ময়দার তাল রাখা আছে। মনে হচ্ছে যেন ময়দার স্তূপ আমাকে বলছে, সেরে ফেল এখনই কাজটা সেরে ফেল।
আমি কাজ সারলাম।
সকালে আমার দোকানের কর্মচারী আসবার পর আমরা ওই ময়দা সেঁকে রুটি বানালাম। সে চলে যেতেই চুল্লীর পাশে বসে আমার বেশ ভাল বোধ হলো তা হলে গিম্পেল, এতদিনের শোধ আজ তোলা হচ্ছে। বাইরে বেশ ঠাণ্ডা থাকলেও চুল্লীর কারণে ঘরের ভেতরটা গরম। এরকম আরামদায়ক উষ্ণতায় আমার কেন যেন ঝিমুনি চলে এলো
ঘুমের মাঝে এবার চলে এলো আমার মৃত স্ত্রী এলকা, সে রাগত স্বরে বলে। এসব কী করেছ, গিম্পেল।
কতদিন পর দেখলাম ওকে, আমি ফোঁপাতে ফোপাতে বললাম, সব তোমার দোষ, এলকা। সব দোষ তোমার।
তুমি বোকা, সে বলল। এমন বেকুব কেন তুমি? আমি খারাপ ছিলাম বলে তোমাকেও তা হতে হবে? আমি নিজেকে ছাড়া কাউকে ঠকাইনি, এর জন্য আমাকে মূল্য দিতে হচ্ছে।  
আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। কালো হয়ে আসা একটা অবয়ব। আমি কাঁপতে কাঁপতে জেগে উঠলাম। অনেকক্ষণ কোনও কথা বলতে পারলাম না। মনে হলো সবকিছু শূন্যে ভাসছে। একটা ভুল পদক্ষেপ ফেললে আমি সারা জীবন হোঁচট খাব। কিন্তু ঈশ্বর আমাকে কৃপা করলেন। বড় কড়াইতে করে সব রুটি নিয়ে আমি উঠোনে গেলাম। ঠাণ্ডায় শক্ত হয়ে যাওয়া মাটি খুঁড়ে বড় একটা গর্ত তৈরি করলাম।
আমার কাজ দেখে কর্মচারীটি দৌড়ে এসে বলল, এসব কী। করছেন, সার।  
আমি দেখতে পেলাম তার মুখ মৃতদের মত ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে।
আমি জানি আমি কী করছি। তার চোখের সামনে সব রুটি মাটি চাপা দিলাম আমি।
বাড়ি ফিরে আমার সব টাকা-পয়সা বাচ্চাদের মাঝে ভাগ করে দিয়ে বললাম, গত রাতে তোমাদের মাকে দেখেছি। সে খুব কষ্টে আছে।
বাচ্চারা এত অবাক হলো যে কেউ কিছু বলতে পারল না।
আমি ধীরে ধীরে বললাম, ভাল থেকো, আর ভুলে যেয়ে গিম্পেল বলে কেউ একজন এখানে ছিল। তারপর আমি ধর্মগ্রন্থে চুমু খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। লোকজন আমাকে দেখে দারুণ অবাক হয়ে বলল, কোথায় চললেন আপনি?
আমি আস্তে আস্তে বললাম, পৃথিবীর পথে। কাজেই আমি ফ্রাম্পোল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। সারা পৃথিবীতে হাঁটতে থাকলাম আমি। ভাল লোকজন কখনোই আমাকে অবহেলা করল না। অনেক বছর পথ পরিক্রমণ করে বৃদ্ধ হয়ে পড়লাম। আমার সারা শরীর সাদা হয়ে এল। কত আজগুবি মিথ্যা গল্প শুনলাম, তার কোন ঠিক নেই। কিন্তু যতই আমি বেঁচে থেকে বুঝতে শিখি, ততই মনে হয় পৃথিবীতে মিথ্যা বলে কিছু নেই। স্বপ্নে মানুষ যা দেখে, তা তার জীবনে না ঘটলেও অন্য কারও জীবনে ঘটতেই পারে, আজকে কোনও কিছু
হলেও এ জিনিস কাল হতে পারে। পরের বছর যা হবার কথা, তা ও-সময় না হলে একশো বছর পর ঠিকই হবে। তা হলে কী এমন পার্থক্য থাকল?
একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলতে চলতে, নানা নতুন পরিবেশে নতুন লোকজনের সাথে খেতে বসে কত শত গল্প শোনাই আমি তাদের-দৈত্য, যাদুকর, বাতাস, ফল, কিংবা এমন কিছুর, যেটা কোনদিন ঘটেনি। আমার পেছনে বাচ্চারা ছুটতে ছুটতে বলে, দাদু, আমাদের একটা গল্প শোনাও না। অনেক সময় তারা নির্দিষ্ট কোনও বিষয়ে গল্পের আব্দার করে। আমি সবসময় তাদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করি। একদিন এক নাদুস নুদুস ছেলে বলে, দাদু, এ গল্প তো আমাকে আগেও শুনিয়েছ।
দাদুমণি, এক অর্থে তুমি ঠিকই বলেছ।  
এমনও হতে পারে, আমার জীবনের সমস্তই আসলে স্বপ্নে ঘটেছে।
অনেক বছর হলো আমি ফ্রাম্পোল শহর ছেড়ে এসেছি, কিন্তু যখনই চোখ বুজি, নিমেষেই চলে যাই সেখানে। সেখানে গিয়ে কাকে দেখি, জানেন? এলকা-সে যেন আমাদের ঘরে দাঁড়িয়ে আছে, যেমনটি সে দাড়িয়েছিল আমাদের প্রথম সাক্ষাতের সময়। কিন্তু এখন তার মুখ অপার্থিব দ্যুতিতে উজ্জ্বল। জেগে থাকলে আমি সব ভুলে যাই, কিন্তু ঘুমিয়ে পড়লেই সমস্তটা পরিষ্কার হয়ে আসে। এলকা একজন সাধু-সন্তের মতই আমার যাবতীয় প্রশ্নের জবাব দেয়। আমি অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলি, এলকা, আমাকে সাথে নিয়ে নাও। এলকা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, আরেকটু ধৈর্য ধারণ করতে। মাঝে মাঝে সে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। জেগে উঠে আমি তার ঠোটের ছোঁয়া এবং কান্নার লবণাক্ত স্বাদ অনুভব করতে পারি।
যে জীর্ণ কুঁড়েঘরে আমি ঘুমাই, তার মেঝেতে কিছু তক্তা আছে মৃতদের বহন করে নেবার জন্য। কবর খোঁড়ার জন্য গোর খোদকও তৈরি হয়েই আছে। কবর অপেক্ষা করছে, পোকা মাকড়গুলো ক্ষুধার্ত হয়ে বসে আছে। কফিন তৈরি হচ্ছে বহন করতে। আরেকজন মুসাফির অপেক্ষা করে আছেন আমার রেখে যাওয়া বিছানায় উত্তরাধিকার সূত্রে বিশ্রাম নিতে। সময় এলে তাই আমি খুশি মনেই যাত্রা শুরু করব। ওই জায়গাতে যা-ই থাকুক না কেন, তা-ই সত্য। কোনও কুটিলতা, বঞ্চনা, উপহাসের স্থান নেই সেখানে। ঈশ্বর নিজেই সেখানে অভ্যর্থনা জানাবেন। সেখানে এমনকী এই হাবা গিম্পেলও কখনও প্রতারিত হবে না।
মূলঃ আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার
রূপান্তরঃ হাসান শিবলী

No comments:

Post a Comment

Popular Posts