মজার গল্প, উপন্যাস, গোয়েন্দা কাহিনী, ছোট গল্প, শিক্ষামূলক ঘটনা, মজার মজার কৌতুক, অনুবাদ গল্প, বই রিভিউ, বই ডাউনলোড, দুঃসাহসিক অভিযান, অতিপ্রাকৃত ঘটনা, রুপকথা, মিনি গল্প, রহস্য গল্প, লোমহর্ষক গল্প, লোককাহিনী, উপকথা, স্মৃতিকথা, রম্য গল্প, জীবনের গল্প, শিকারের গল্প, ঐতিহাসিক গল্প, অনুপ্রেরণামূলক গল্প, কাহিনী সংক্ষেপ।

Total Pageviews

Monday, August 24, 2020

দ্যা গোল্ড বাগ - এডগার অ্যালান পো - বাংলা অনুবাদ - The Gold-bug - Edgar Allan Poe - Bengali Translation - Part 3 of 4

দ্যা গোল্ড বাগ - এডগার অ্যালান পো - বাংলা অনুবাদ - The Gold bug - edgar Allan Poe - Bengali Translation
Previous Part Link (আগের পর্ব)

দ্যা গোল্ড বাগ - এডগার অ্যালান পো - বাংলা অনুবাদ - The Gold-bug - Edgar Allan Poe - Bengali Translation - Part 3 of 4


-ব্যাটা বদমাইশ যেভাবে চিৎকার করতে লেগেছে তাতে কবর থেকে মড়া পর্যন্ত উঠে আসবে মনে হচ্ছে। চিন্তিত, বিরক্ত মুখে বলল লেগ্রাণ্ড। তা হলে বিপদের ষোলোকলা পূর্ণ হয়। এই ব্যাটা জুপ, থামা ওটাকে।
কোদাল রেখে উঠে এল জুপিটার। এই শীতের মধ্যেও ঘেমে ভূত হয়ে গেছে। কোমর থেকে দড়ির বেল্টটা খুলে আস্তে আস্তে জার্তিনের দিকে এগিয়ে যেতেই মতলব বুঝতে পেরে ভাগবার চেষ্টা করল ওটা। ঝাপিয়ে পড়ল জুপিটার। পিছনের ঠ্যাংটা কোনওমতে চেপে ধরল। দড়িটা দিয়ে কষে মুখটা বেঁধে ছেড়ে দিল ওটাকে। এদিক ওদিক লাফিয়ে দড়িটা খোলার কসরৎ দেখাতে শুরু করল জার্ডিন। কোদালটা তুলে নিয়ে গর্তটার মধ্যে নেমে পড়ল লেগ্রাণ্ড। পালা করে আমি, লেগ্রাণ্ড আর জুপিটার মাটি খুঁড়ে চললাম। ফুট তিনেক মত গর্ত হতেই সুবিধার জন্যে গর্তের ব্যাস আরও খানিকটা বাড়িয়ে নিলাম। চার, সাড়ে চার ফিট গর্ত খোড়া যখন শেষ হলো তখন ঘড়ির কাঁটা নটার ঘর পেরিয়ে গেছে। কোদালটা বাইরে ছুঁড়ে দিয়ে গর্ত থেকে উঠে এল লেগ্রাণ্ড।
-চলো, যাওয়া যাক এবার।
প্রায় কান্নার মত শোনাল ওর গলা। মাটি থেকে কোটটা তুলে নেবার সময় প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল, কোনওরকমে সামলে নিল। ওর মুখের দিকে তাকাতে পারলাম না। জুপিটার কোদাল কাস্তেগুলো গুছিয়ে নিয়ে আগে আগে রওনা দিল। পিছনে লেগ্ৰাণ্ড, তার পিছনে আমি, আমার পিছনে জার্ডিন। একটু এগোতেই হঠাৎ করে লেগ্রাণ্ড বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল জুপিটারের ঘাড়ে। ধক করে উঠল বুকের ভিতরে। বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে ও। শতিনেক ডলার তো যাবেই, বেশিও যেতে পারে, কিন্তু ওকে এখান থেকে নেব কী করে। মাথায় এক ঘা বসিয়ে দেব নাকি! আশপাশে তাকালাম-আঘাত করার জন্যে কিছু একটা দরকার। ততক্ষণে দেখি, জুপিটারের গলা চেপে ধরে ওকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে লেগ্রাণ্ড। ভয়ে চোখ ঠিকরে আসার অবস্থা হয়েছে জুপিটারের। দু'হাত নেড়ে কী যেন বোঝাবার চেষ্টা করছে, একটা শব্দও বেরোচ্ছে না গলা দিয়ে। দাঁত কিড়মিড় করে বলল লেগ্রাণ্ড, -শয়তানের বাচ্চা, বল তোর বা চোখ কোনটা?
শুধু হাঁ করল জুপিটার। গলা ছেড়ে দিয়ে ঝাঁকুনি লাগাল লেগ্রাণ্ড ওকে।
--বলছি, স্যার এই তো আমার বাঁ চোখ, থর-থর করে কাঁপতে কাপতে ডান হাতটা দিয়ে ডান চোখটা দেখাল জুপিটার।
-ইয়া হু, আনন্দে চিল্কার করে উঠল লেগ্রাণ্ড, চল, চল পাজি, শিগগির চল, কোদাল-টোদালগুলো ওঠা তাড়াতাড়ি। আমার দিকে ফিরে বলল, এসো তাড়াতাড়ি, আসল খেলা দেখাব এবার।
মাথা মুণ্ডু কিছু বুঝলাম না। বোকার মৃত রওনা হলাম পিছু পিছু। টিউলিপ গাছটার গোড়ায় পৌছালাম আবার। কাস্তে, কোদাল নামিয়ে রাখল জুপিটার।
লেগ্রাণ্ড জিজ্ঞেস করল, খুলিটার মুখ নীচের দিকে ছিল না ওপরের দিকে ছিল?
-ওপরের দিকে, স্যার
-ঠিক আছে, এবারে বল তোর বাঁ চোখ কোনটা?
-এইটা, স্যার, ভয়ে ভয়ে ডান চোখ দেখাল জুপিটার।
-ব্যাস, ব্যাস, দিব্যি চলে যাবে ওতেই, খুশি মনে বলল লেগ্রাণ্ড। পোকাটা ধরিয়ে দিল ওর হাতে। ওঠ, এবারে পোকাটা ডান চোখ দিয়ে নামাবি, বুঝেছিস? ভুল হলে এবার তোকে ওই গর্তটার মধ্যে চাপা দেব।
কোনও কথা না বলে উঠতে শুরু করল জুপিটার, বেশ কিছুক্ষণ পরে পাতার ফাঁক দিয়ে ঝিকমিক্ঝিকমিক করতে করতে নামতে শুরু করল পোকাটা। নামতে নামতে এক সময় মাটি ছুঁলো, আগের জায়গা থেকে ইঞ্চি তিনেক দুরে। খুঁটিটা কুড়িয়ে নিয়ে পুঁতে দিল ওখানে। তারপর হাঁক ছাড়ল ওপরের দিকে তাকিয়ে, সুতো ছেড়ে দিয়ে নেমে আয়। আগের মতই ফিতে ধরলাম আমি। ফিতে ছাড়তে ছাড়তে পিছাতে শুরু করল লেগ্রাণ্ড। পঞ্চাশ ফুট গিয়ে থামল ও। ঝাঁকুনি দিয়ে ফিতেটা সোজা করে খুঁটি দুটো আগের মতই একটা সরলরেখায় নিয়ে এল। পঞ্চাশ ফুটের মাথায় তৃতীয় খুঁটিটা যেখানে পুঁতল, সে জায়গাটা আগের গর্তের থেকে বেশ খানিকটা দূরে। আগের মতই ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে বৃত্ত আঁকল লেগ্রাণ্ড। তারপর কোদাল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ঘণ্টা দেড়েক ধরে পালা করে গর্ত করে গেলাম আমরা। হঠাৎ চিৎকার করে উঠল জার্ডিন। কোন্ ফাকে মুখের বাঁধন খুলে ফেলেছে খেয়ালই করিনি। লাফ দিয়ে পড়ল গর্তের মধ্যে। পাগলের মত মাটি আঁচড়াতে লাগল নখ দিয়ে খানিকটা মাটি সরাতেই ছেঁড়া একটা কাপড় বেরিয়ে এল, মরচে ধরা পেতলের বোতাম ঝুলছে তাতে। তারপই বেরোল একটা হাড়ের টুকরো কুকুরটাকে কোদালের ঘা মেরে ভাগাল লেগ্রাণ্ড। কোদালের কয়েকটা কোপ মারতেই বেরিয়ে পড়ল মানুষের দুটো খুলি। প্রচণ্ড উৎসাহে দুজন মিলে খোড়া শুরু করলাম এবার। এরপর বেরোল বড় একটা স্প্যানিস ছোরা আর গোটা কয়েক সোনার মুদ্রা। লেগ্রাণ্ডের দিকে তাকিয়ে দেখি হতাশায় কালো হয়ে উঠেছে মুখটা। তবুও ঝুঁকে পড়ে আবার খুঁড়তে শুরু করল ও। আমিও হাত লাগালাম। একটু পরে ঘুরে দাঁড়াতে যেতেই হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। একটুর জন্যে বেঁচে গেলাম কোদালের নীচে পড়া থেকে। ওদিকে কোনও খেয়ালই নেই লেগ্রাণ্ডের। কোদাল নামিয়ে রেখে তাকিয়ে আছে আমার পায়ের দিকে। তাকিয়ে দেখি লোহার কড়া একটা। লাফ দিয়ে উঠলাম। পাগলের মত কোদাল চালালাম চারপাশে। আস্তে আস্তে বেরিয়ে পড়ল শক্ত কাঠের বিরাট একটা সিন্দুক। লম্বায় কমপক্ষে সাড়ে তিন ফুট, তিন ফুট চওড়া আর আড়াই ফুট উঁচু। ধারগুলো লোহার পাত দিয়ে মোড়ানো। দুটো মস্ত বড় তালা ঝুলছে ওটাতে। দুপাশে চারটে করে আটটা লোহার কড়া লাগানো। কড়াগুলো ধরে প্রাণপণে টান লাগালাম দুজন। গর্তের মধ্যে লাফ দিয়ে নেমে হাত লাগাল জুপিটার। এক চুল নড়ল না বাক্সটা।
-এভাবে হবে না, তালা ভাঙতে হবে, বলল লেগ্রাণ্ড। কুড়াল হলে সবচেয়ে ভাল হত, এখন কোদাল ছাড়া গতি নেই কোদালের উল্টো দিকে দিয়ে কষে বাড়ি লাগাল তালাটার গায়ে।
প্রাণপণে ঘা মারল জুপিটার। গোটা ছয়েক ঘা মারতেই হার মানল তালা। অন্য তালাটাও একই ভাবে খুলে ফেলল জুপিটার। কড়া থেকে দূরে ছুঁড়ে মারল বাইরে। নীচু হয়ে কড়া দুটো ধরল লেগ্রাণ্ড। মুখটা ফ্যাকাসে, হাত দুটো একটু একটু কাঁপছে। এক ঝটকায় খুলে ফেলল ডালাটা। ম্লান হয়ে গেল বাকি সব।
একটা সূর্য যেন জ্বলে উঠল একসাথে। ধাঁধিয়ে গেল চোখ। কী সত্যি নাকি স্বপ্ন! অবাস্তব মনে হলো সবকিছু। লক্ষ লক্ষ সোনার মুদ্রা, গহনা আর শত শত হীরে চাঁদের আলোয় ঝকমকিয়ে উঠল। মনে হলো আগুন লেগেছে বুঝি ওখানে।
কতক্ষণ ওভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না, জার্ডিনের ডাকে হুঁশ ফিরল। লেগ্রাণ্ডের দিকে তাকিয়ে দেখি ঠোটটা কাঁপছে থরথর করে, চিকচিক করছে চোখের কোণ জুপিটার দুহাত বুকের কাছে জড়ো করে ওপরের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে কী যেন বলছে। পুরোপুরি বাস্তবে ফিরে এলাম সবার আগে। লেগ্রাণ্ড এর কাঁধ ধরে ঝাকুনি লাগালাম, শূন্য দৃষ্টিতে ফিরে তাকাল আমার দিকে। ভয় পেয়ে গেলাম। আরও জোরে ঝাকুনি লাগালাম, এবারে সংবিৎ ফিরল। একটু লজ্জিত হাসল জুপিটারের দিকে তাকিয়ে দেখি একই ভাবে বসে আছে ও। লেগ্রাণ্ড ওর হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দিতেই হুশ হলো ওর।
-এগুলো এবারে তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করতে হয়। সময় বেশি নেই। আমিই প্রথম কথা বললাম। কীভাবে নেবে?
চিন্তায় পড়ে গেল লেগ্রাণ্ড।
-আসলে এমন ভারি জিনিস নিতে হবে ভাবিনি। আর, তাড়াহুড়োতে বস্তা বা দড়িও আনা হয়নি। কী যে করি। ঠিক আছে, আগে বাক্সটা ওপরে তোলার ব্যবস্থা করি।
বাক্স থেকে ধনরত্ন বের করে গর্তের পাশে জমা করতে শুরু করল লেগ্রাণ্ড। হাত লাগালাম আমিও। বেশ খানিকটা করে নামাই আর ঝাকুনি দিয়ে দেখি বাক্সটা ওঠানোর মত ওজনে এল কিনা। প্রায় অর্ধেকের মত নামানোর পর তুলতে পারলাম ওটাকে। লেগ্রাণ্ড বলল, যতটুকু পারি সাথে নিয়ে যাই, বাদবাকি জার্ডিন পাহারা দিতে থাক। বাড়ি থেকে বস্তা আর যা যা লাগে নিয়ে এসে ওগুলো নিয়ে যাব। ছাড়া আর করারও কিছু দেখছি না। বাক্স থেকে আরও কিছু সোনাদানা নামিয়ে দুজনে বইবার মত জিনিসপত্র রাখলাম। নামিয়ে রাখা ধনরত্নগুলোকে লতা পাতা দিয়ে ঢেকে দিলাম। লেগ্রাণ্ড ওর সোয়েটার আর মাফলারটা খুলে ফেলে দুটো বিড়ে মত বানিয়ে ফেলল তিনজনে মিলে ধরাধরি করে বাক্সটা উঠালাম। ওরা বাক্সটা একটু উঁচু করতেই আমি বিড়ে দুটো দুজনের মাথায় জায়গামত বসিয়ে দিলাম। জার্ডিনকে পাহারায় রেখে ফিরে চললাম আমরা। সামনে লণ্ঠন নিয়ে আমি, পিছনে ওরা দুজন। পালা করে বাক্সটা বয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন হাঁটুতে হাঁটুতে ঠোকাঠুকি শুরু হয়ে গেছে আমাদের। গ্রোগ্রাসে গিললাম হাতের কাছে যা পেলাম। জুপিটার কফি বানিয়ে নিয়ে এল এরই মধ্যে। একটু যেন জোর ফিরে এল পায়ে বিছানায় লম্বা হয়ে পড়ার ইচ্ছেটা অতি কষ্টে দূর করতে হলো। গোটা তিনেক বস্তা আর দড়ি নিয়ে আবার রওনা দিলাম বাকি জিনিসগুলো তিনটে বস্তায় ভরে যখন কুটিরে পৌছালাম কুয়াশার মধ্যে দিয়ে ভোরের আলো তখন চুইয়ে, আসতে শুরু করেছে। দরজাটা বন্ধ করেছে জুপিটার, শুধু এটুকুই মনে আছে, তারপর কীভাবে যে জামা, জুতো খুলেছি, বিছানা পর্যন্ত গিয়েছি কিছু মনে নেই। মড়ার মত ঘুমালাম দুপুর পর্যন্ত। লেগ্রাণ্ডের, ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙল। দেখি উঠে এর মধ্যেই জুপিটারকে রান্নায় বসিয়ে দিয়েছে। গোসল করে পোশাক পাল্টে খেতে বসে গেলাম। রাক্ষসের মত গিললাম যা পড়ল পাতে। সবশেষে এককাপ কড়া কফি খাবার পর অনেকটা ঝরঝরে লাগল ভাল করে দরজা-জানালা বন্ধ করে জোরালো আলো জ্বালিয়ে দিলাম ঘরের মধ্যে তারপর তিনজনে বসলাম গতরাতের সঞ্চয় পরীক্ষা করতে। পরীক্ষা করব কী, নেড়েচেড়ে দেখতেই আনন্দে আটখানা হয়ে ওঠে লেগ্রাণ্ড আর জুপিটার হাত ঢুকিয়ে তুলে নেয় কিছু মুদ্রা, ওপর থেকে ঝন্ঝন্করে ছেড়ে দেয় আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে দুজন। কষে ধমক লাগালাম। এবারে কাজে লাগল দুজনই। সমস্ত জিনিসগুলোকে ভাগ করতে শুরু করলাম। স্বর্ণমুদ্রা, গহনাপত্র, বাসন-কোসন, দামী পাথর, ঘড়ি সব আলাদা আলাদা করে ফেললাম। কোনও রুপোর লেশমাত্র নেই ওগুলোর মধ্যে।
প্রথমে ধরলাম স্বর্ণমুদ্রা। ফরাসী, স্প্যানিশ, জার্মান, ইটালিয়ান, পর্তুগীজ সব দেশের স্বর্ণমুদ্রাই আছে। নানা ওজনের, নানা মাপের। কতগুলো দেখে চিনতেই পারলাম না ওগুলো কোন্ দেশের। মুদ্রাগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য বাদই দিলাম, খুব কম করে ধরেও ওগুলোর দাম দাঁড়াল প্রায় সাড়ে চার লক্ষ ডলার। হীরে পাওয়া গেল এক দশটা। প্রত্যেকটাই বড়সড়, গোটা বারো অস্বাভাবিক রকমের বড়। আঠারোটা উজ্জ্বল চুনি, পান্না তিন দশটা, একুশটা নীলা আর একটা ওপাল। এর বেশির ভাগই গহনা থেকে খুলে নেয়া। গহনাগুলো ঘা মেরে ওগুলোকে চেনার অবস্থায় রাখা হয়নি। জড়োয়ার অলঙ্কার আর পাকা সোনার গহনা গোনার চেষ্টা করলাম বারদুয়েক।
-দুত্তোর, বলে সরে এল লেগ্রাণ্ড ওখান থেকে। ওগুলো গুনে শেষ করা যাবে না, অমনি থাক ওগুলো। দুল, পেলাম দুশটা, হার তিরিশটা, সোনার ওপর কারুকাজ করা বাতিদান পাঁচটা, সোনার ওপর চুনি বসানো পান পাত্র দুটো, এক সাতানব্বইটা সোনার ঘড়ি, সোনার মূর্তি তিরাশিটা আর সোনার বাঁটের ওপরে পান্না বসানো দুটো তলোয়ার। সব মিলিয়ে ওজন প্রায় সাড়ে তিন পাউণ্ড। হিসাব করতে গিয়ে মাথা খারাপ হবার দশা হলো আমাদের। অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে শুধু জিনিসের দাম ধরে যে হিসাব পেলাম তাতে চোখ উল্টে গেল আমাদের। খুব কম করে ধরেও প্রায় পনেরো লক্ষ ডলার। পরে অবশ্য বিক্রী করতে গিয়ে বুঝেছিলাম, চোখ উল্টানোর আরও কিছু বাকি ছিল আমাদের।
সমস্ত হিসাব নিকাশ শেষ করে বাক্স বন্ধ করে যখন উঠলাম রাত তখন শেষের দিকে। কফি বানিয়ে নিয়ে এল জুপিটার
চেয়ারটাকে ফায়ার প্লেসের যতটা সম্ভব কাছে নিয়ে গিয়ে বসলাম। আয়েশ করে চুমুক লাগালাম কফিতে।
-এবারে ঝুলি থেকে বেড়ালটা বের করে দেখি, বললাম লেগ্রাণ্ডকে। তোমার সোনাপোকা কী করে সোনার সন্ধান নিয়ে এল।
চোখ বুজে মিটিমিটি করে হাসতে লাগল লেগ্রাণ্ড আর আস্তে আস্তে মাথা দোলাতে লাগল। কফি শেষ করে ঠিক করে রাখলাম কাপটা। এবারে চোখ খুলল লেগ্রাণ্ড। এক চুমুকে বাকি কফিটুকু শেষ করে কাপটা রেখে দিল পাশে।
-শুরু করল লেগ্রাণ্ড, ঘটনাটা, খুব সাধারণ। সে রাতের কথা আশা করি মনে আছে তোমার, যেদিন সোনা পোকাটার ছবি এঁকে দেখালাম তোমাকে। তুমি অবশ্য দেখে বলেছিলে মড়ার মাথা এঁকেছি। এবং আশা করি এখন অস্বীকার করবে না যে বেশ একটু বিদ্রুপই করেছিলে আমার আঁকা নিয়ে, সুতরাং আমার মেজাজটাও একটু গরম ছিল। যাহোক বিরক্ত হয়ে আগুনে ফেলে দিতে গিয়েছিলাম কাগজটা। ফেলে দিতে গিয়েও কী মনে করে তাকালাম, দেখি স্পষ্ট মড়ার খুলি আঁকা ওর মধ্যে। হাঁ হয়ে গেলাম। কোথেকে এল ওটা? কাগজটা উল্টে দেখি অন্যদিকে পোকাটা ঠিকই আছে। একই রকম দেখতে প্রায়, কিন্তু দ্বিতীয় ছবিটা এল কীভাবে? ছবি আঁকার আগে ভাল করে উল্টেপাল্টে পরিষ্কার জায়গা খুঁজেছিলাম। ছবিটা যে আগে ওখানে ছিল না তা বাজি রেখে বলতে পারি। সুতরাং প্রশ্ন হলো ছবিটা এল কীভাবে? ভূত নাকি? মাথা গরম হয়ে গেল আমার। অন্য কোনও দিকে মন দেবার অবস্থাও রইল না রকমসকম দেখে তুমিও চলে গেলে। ভালই হলো। তুমি যাবার পরে ভাল করে পরীক্ষা করলাম কাগজটা। দেখি ওটা আসলে একটা পার্চমেন্ট-এর টুকরো। কোথায় পেলাম, কোথায় পেলাম ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মনে পড়ল কোথায় পেয়েছি সমুদ্রের ধারে, মেইন ল্যাণ্ডে। জায়গাটা এখান থেকে মাইল চারেক হবে। সোনা পোকাটাকেও ওখানে পাই। পোকাটা দেখামাত্র যেই ধরতে গেছি, রাম কামড় বসিয়ে দিল হাতে উহ করে তো ফেলে দিলাম পোকাটাকে, দেখি রওনা দিয়েছেন ভদ্রলোক (পোকা) জুপকে বললাম তাড়াতাড়ি ধরতে। ব্যাটা ভীতুর ডিম, খালি হাতে ধরবেই না। আশপাশে তাকিয়ে ধরার মত কিছু একটা খুঁজল। চারপাশে ভাঙা জাহাজের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে, তারমধ্যে চোখ পড়ল ওই পার্চমেন্টটার ওপরে। একটা কোণা বেরিয়ে ছিল বালির বাইরে। ওটা বের করে পোকাটা ধরল জুপ। ফিরছি, রাস্তায় লেফটেন্যান্ট-এর সঙ্গে দেখা। দেখালাম ওকে দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ। বলল বাসায় নিয়ে যাবে একদিনের জন্যে, বউ ছেলে মেয়েকে দেখাবে। দিলাম ওর পকেটে চালান করে। তখনই হয়তো আনমনে পার্চমেন্টটা রেখে দিয়েছিলাম পকেটে। তারপর সেদিন পোকার ছবিটা আঁকবার সময় ওটা ছাড়া আর কিছুই পেলাম না। সুতরাং যখনি বের করতে পারলাম ওটা কোথায় পেয়েছি, সাথে সাথে জাহাজের ভাঙা টুকরোগুলোর কথা মনে ভেসে উঠল। আর তারপরই বিদ্যুৎ চমকের মত মাথায় এল, লোকে পার্চমেন্ট কাগজ ব্যবহার করে স্থায়ী কিছু লেখার জন্যে, ধরো দলিল বা নকশা। সুতরাং মড়ার খুলি আঁকা কাগজটা নিশ্চয়ই কোনও জলদস্যুর আঁকা নকশা, জাতীয় কিছু হবে। উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। ঘুম হারাম হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবতে বসলাম। প্রথমেই প্রশ্ন হলো ছবিটা এল কী করে? আমি আঁকিনি, তুমি আঁকোনি, জুপের তো প্রশ্নই ওঠে না, তা হলে কে? আর ঘটনাটা ঘটেছে কাগজটা আমার হাত থেকে তোমার হাতে যাবার সময়টুকুর মধ্যে। একবার মনে হলো কোনও প্রেতাত্মার কাজ নয়তো? ধারণাটাকে অবশ্য হেসে উড়িয়ে দিলাম তক্ষুণি। খুব ভালভাবে মনে করতে লাগলাম তখনকার ঘটনাগুলো। বাইরে ঠাণ্ডা, ঘরে আগুন জ্বলছে। আমি বিছানার কাছে, তুমি ফায়ার প্লেসের কাছে, জুপ ওই কোণাটায়। তারপর কাগজটা আমি তোমার হাতে দিলাম, তুমি যখনই দেখতে গেলে তখনই ঘরে ঢুকল জার্ডিন, লাফ দিয়ে উঠল তোমার ঘাড়ে। তুমি বা হাত দিয়ে ওর পিঠে আদর করতে লাগলে। ওর আদরের চোটে হেলে গেছ ডানদিকে, আর ডান হাতটা সরে গেছে আগুনের দিকে। প্রায় চেঁচিয়ে উঠছিলাম, কাগজটা পুড়ে যাবে বলে,’ তখনি তুমি হাতটা টেনে নিলে বাইরে। তারপরই তো বিদ্রুপ শুরু করলে আমার আঁকা নিয়ে। সুতরাং আমার ধারণা হলো, ছবিটা আগে থেকেই ছিল, এখন আগুনের আঁচে ফুটে উঠেছে। এমন লেখার কথা তো শুনেছই অনেক। রাস্তায় লটারি করে দিল্লীকা লাড়ু বা স্নো পাউডারের; দেখেছই তো, পানির মধ্যে ফেলে দিলে লেখা ফুটে ওঠে, অনেকটা ওইরকম। ছবিটা ভাল করে লক্ষ্য করেছিলাম তখনই। ধারের দিকে যত স্পষ্ট ছিল মাঝের দিকে ততটা নয়। তখনই কাগজটা আবার দেখি অনেকটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ছবিটা, কোনও সন্দেহ রইল না আর। সঙ্গে সঙ্গে ফায়ারপ্লেসের কাছে উঠে গেলাম। ভাল করে রম করলাম কাগজটাকে। স্পষ্ট ফুটে উঠল খুলির ছবি, খুলির বেশ নীচে, ডান দিকে একটা ছাগল ছানার ছবি।
হাঃ হাঃ করে হেসে উঠলাম ওর কথা শুনে। বললাম, ব্যা ব্যা করছিল বুঝি। তা ওই ছাগলের বদৌলতেই এত কিছু?
লেগ্রাণ্ড হাসল না একটুও। বলল, ছাগল নয়, ছাগলের বাচ্চা।
-কেন, ছাগলের বাচ্চা কী ছাগল না?
-সব সময় নয়।
-কী রকম?
-আগে শোনো, তারপর বোঝ। কাগজটার ওপরে খুলির ছবি, নীচে ডানপাশে ছাগলছানার ছবি, ঠিক যেন মনোগ্রাম করা কাগজে কিছু লিখে সই করা। সই-এর জায়গাটাতেই ওই ছাগলছানার ছবি। নিশ্চয়ই এমন কারও সই যার নাম ওই ছাগলছানার সাথে জড়িত। কী হতে পারে, কী হতে পারে ভাবতেই মনে পড়ল ছাগলছানার ইংরেজি হলো কিড আর তক্ষুণি বুঝলাম হচ্ছে ক্যাপ্টেন কিডের নকশা। এক লাফে ছাদ ফুঁড়ে বেরিয়ে যাবার ইচ্ছে হলো খুশিতে ক্যাপ্টেন কিড আর তার গুপ্তধনের কথা কে না জানে। কথাটা কিংবদন্তীর মত। কত শত বছর ধরে সে চলে আসছে তার ঠিক নেই। আমি শুনেছি আমার বাবার কাছে, বাবা শুনেছেন দাদার কাছে। ধারণা করা হয় আটলান্টিকের ধারে কাছে কোথাও আছে এই অসীম সম্পদ। অনেকে হয়তো খোজ করে পায়নি, ফলে ছড়িয়ে পড়েছে কথাটা। আর যেহেতু কেউ পেয়ে গেছে এমন কথা শুনিনি কখনও, তাই ধরে নিলাম গুপ্তধন এখনও গুপ্তই আছে, কেবল মাথা খেলিয়ে বের করার অপেক্ষা। সুতরাং কাজে নেমে পড়লাম।
এতক্ষণে একটু ফাঁক পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু শুধু মড়ার মাথা আর ছাগলের মাথা নিয়ে কী খেললে সেটা তো আমার মাথায় ঢুকছে না।
-ঢুকবে বস, ঢুকবে, ধৈর্য ধর। পার্চমেন্টটাকে আবার গরম করলাম কিন্তু খুলি আর ছাগলছানার মধ্যে কোনও লেখা ফুটল না। চিন্তা করলাম নিশ্চয়ই লেখাটার ওপর ময়লা জমেছে। পানি গরম করলাম তক্ষুণি। গরম পানি দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করলাম কাগজটা, তারপর পানির মধ্যেই ছেড়ে দিলাম ওটাকে। পানি ফুটতে শুরু করতেই নামিয়ে নিলাম কাগজটা। এর ফল যা হলো, দাঁড়াও, দেখাই তোমাকে।
একটা বাক্সের তালা খুলে ভেতর থেকে একটা ডাইরী বের করল লেগ্রাণ্ড। ঔর মধ্যে থেকে ছোট্ট কাগজের টুকরোটা বের করে ফায়ারপ্লেসের মধ্যে ধরল আস্তে আস্তে ছবি ফুটে উঠল উপরে, মাঝখানে মড়ার মাথার খুলি, নীচে, ডান দিকে ছাগলছানার ছবি আর মাঝখানে হিজিবিজিতে ঠাসা।
-দাঁড়াও, মাঝখানের লেখাগুলো তোমাকে দেখাই। লিখে রেখেছি খাতায়।
ডাইরিটা খুলে লেখাটা বের করে আমার হাতে দিল লেগ্রাণ্ড। দেখলাম ইংরেজি সংখ্যা আর চিহ্ন দিয়ে লেখা 53++t305)) 6*; 4826) 4+.) 4+); 806* 48 8760)) 85;1 + (; + * 8 t 83 (88) 5 * t; 46 ( 88 * 96 * ? ; 8 ) * + (; 485) ; 5 * 1 2 * + (; 4956*2 (5 * 4) 878 * ; 4069285) ; (6f8) 4++ ;1 (+9 48081; 8 8+ 1; 48 + 85; 4) 485 t 528806 * 81 (+ 9 48 ; (88 4 (+ ? 34 ; 48 ) 4°
161; 188; + ?;

দেখাই সার। মাথামুণ্ডু কিছু বুঝলাম না। লেগ্রাণ্ডের হাতে ডাইরিটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বললাম, এর মধ্যে যদি বাদশা সোলায়মানের রত্নভাণ্ডারের কথাও লেখা থাকে, আমার সাধ্য কি এর মানে বের করি।
মিটিমিটি হাসতে লাগল লেগ্রাণ্ড।
-তা হলেই ভেবে দেখো দুজনের মগজে কত তফাৎ, মাথার পাশে আস্তে দুটো টোকা মেরে বলল ও।
-তা বের করলে কেমন করে সেটাই বলো দেখি, একটু ঝঝের সাথে বললাম।
                                                                     Next Part Link

No comments:

Post a Comment

Featured Post

সুইসাইড – থ্রিলার গল্প - রবিন জামান খান – Suiside - Thiller story Bangla

  Thiller story Bangla,থ্রিলার গল্প, সুইসাইড সুইসাইড – থ্রিলার গল্প - রবিন জামান খান – Suiside - Thiller story Bangla দৌড়াতে দৌড়াতে মি...