মজার গল্প, উপন্যাস, গোয়েন্দা কাহিনী, ছোট গল্প, শিক্ষামূলক ঘটনা, মজার মজার কৌতুক, অনুবাদ গল্প, বই রিভিউ, বই ডাউনলোড, দুঃসাহসিক অভিযান, অতিপ্রাকৃত ঘটনা, রুপকথা, মিনি গল্প, রহস্য গল্প, লোমহর্ষক গল্প, লোককাহিনী, উপকথা, স্মৃতিকথা, রম্য গল্প, জীবনের গল্প, শিকারের গল্প, ঐতিহাসিক গল্প, অনুপ্রেরণামূলক গল্প, কাহিনী সংক্ষেপ।

Friday, August 21, 2020

আকাশে কুকুর ভুকে - মজার গল্প – হাসির গল্প – ছোট গল্প


আকাশে কুকুর ভুকে মজার গল্প  হাসির গল্প  ছোট গল্প
আকাশে কুকুর ভুকে - মজার গল্প হাসির গল্প ছোট গল্প

তো, আজকের এই গল্পটি আমি শুনেছি মানিকগঞ্জের বেতিলা স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক জনাব নূর মোহাম্মদের কাছে। তিনি বহু গল্প-সিমাসা শুনেছেন মানিকগঞ্জের জাগিরের বিখ্যাত মাতবর সালিশদার মরহুম শহর মহর ব্যাপারীর কাছে। তাদের বলা একটি গল্প আজ পাঠকদের জন্য পেশ করছি।
আগে এবং এখনো গ্রামে বিচার সালিশ যারা করতো বা করে তারা সঙ্গে রাখতে পাইতান বা পিটুরি অর্থাৎ মাতবরের সাহায্যকারী বা সমর্থনকারী। তারাও হতো ধূর্ত-ধুরন্ধর এবং কেউ কেউ এমনই ভূয়োদর্শী যে মাতবরকেও তাদের কাছ থেকে সাহায্য নিতে হতো সালিশের জন্য সাধারণত টাকা-পয়সা নিতেন না দশগাঁয়ে ডাক পড়ে এমন সালিশদাররা। তবে কেউ কেউ নিতেন। তারা তার একটা অংশ দিতেন পাইতানকে।
একবার এক মাতবর মনে করলেন আমাকে সাতগাঁয়ে চিনে, বিচার-আচারও করি আমিই। খামোখা পাইতান-পিঠুরিকে ভাগ দিব কেন? এবার থেকে বিচারসালিশ একাই করবো যে কথা সেই কাজ। মাতবর বিচার করতে গেছে একা। মানিকগঞ্জের ভাষায় পাইতান নেননি। বিচারে দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক চলে শেষে রায় দেয় মাতবর রায়ের আগে একখানা মোক্ষম সিমাস বা তুলনামূলক গল্প বা মেছাল বলতে হয়। ফলে ওই গল্পের মর্ম বা অর্থ এমন হয় যে তা না মেনে বিতর্ক চলে না। ফলে ধন্য ধন্য পড়ে মাতবরের বুদ্ধির এবং তার অব্যর্থ সিমাসার।
তো, সেদিনের দুপক্ষের যুক্তিতর্ক, সাক্ষীর সাক্ষ্য সব শেষ হবার পর যখন তুলনায় সার কথায় বিচারের রায় আসবে তখন মাতবর বলে : শোন মিয়ারা, একখান মেছাল (উদাহরণ) দেই। সিমাসাকে মেছালও বলে।
সবাই উৎকর্ণ। কারণ, বিচারের মজাটাও এখানে এবং রায়ও আসবে এই মেছালের সুবাদেই
এজন্যই বলে : হাটের আগ, দরবারের পিছ। ভালো জিনিসটা কিনতে হলে, হাটে যেতে হবে আগে; আর বিচারের আগে হাজার কথা হলেও মূলকথা হবে শেষে। তাই এমন বচন।
যাই হোক, মাতবর মেছাল শুরু করবেন, তিনি একটু গলাখাকারি দিলেন। তারপর চোখ বুজলেন। এবার শুরু করবেন। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে বলেন, আসমানে কুকুর ভুকে অর্থাৎ আকাশে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে। সবাই চুপ।
কে একজন বলেঃ মাতবরে আইজ বড়ই মারফতি মেছাল ধরছে। হু হু যে-সে মাতরব তো না। দশগাঁয়ে হের মান্যি-চিন্নি।
কিন্তু মাতবর আর রা কাড়ে না। মেছাল ধরিয়ে দেবার বা কথার মোচড়ে তাকে লাগসই করে তোলার পিঠুরি বা পাইতান তো নাই। একজন টিটকারীর ছলে কেশে ওঠে।
একজন বলে : মাতবরের ভুজং ভাজাং শেষ। পোলাপানে হেসে উঠে। মাতবরের মেছাল আর আসে না। বিব্রত, বিপন্ন মাতবর বলে : খামোশ, আইজ বিচার করুম না। আগামী হপ্তায় এই দিনে এই সময়ে বিচার হইব।
মাতবর ছোটে পাইতানের বাড়ি। পাইতানরে বলে : আইজ ইজ্জত গেছে রে।
পাইতান : ক্যা, মাতবর সাব! কি অইছে?
মাতবর : আর কইস না।
ভাবলাম : তরে ভাগ দিয়ন লাগেতাই তরে নিমু না। একাই বিচার করুম। তা বড় বেজ্জতি হইয়া আইছিরে।
পাইতান : মেছালটা কি দিলেন।
মাতবর : আসমানে কুকুর ভুকেকইয়া আর মিলাইবার পারলাম না। আগামী সমবার আবার দিন দিয়া আইছি। তুই যাবি। ভাগ ঠিকই থাকবো
পাইতান : মেছাল তো ভাল ধরছেন। কোনো চিন্তা কইরেন না। সমবারে বাজিমাৎ কইরা দিমুনে। সোমবারের বিচার সভা।
পাইতান বলে : মাতবর সাব শুরু করেন।
মাতবর : আসমানে কুকুর ভুকে। আবার একথা শুনে সব্বাই হেসে ওঠে।
পাইতান : মিয়ারা থামেন। ব্যাক্কলের মতো হাইসেন না। মাতবর তো জব্বর একখান মেছাল ধরছেন। আপনেরা দুই পক্ষের কথাই শুনছেন। বাদী পক্ষ বিবাদী পক্ষের কথাকে বলছেন : অসম্ভব কোন মতেই মিলানো যায় না আর আমাগো দশগাঁয়ের মাতবর মাতবরের মতই এক লাইনের মেছালে রায় দিয়া দিছে। এইরে সে কয় বুদ্ধি! ঝুনা না হইলে এমন সূক্ষ্ম রায় দেওন যায় না মাতবরি আল্লার দান। এই গুণ সবার থাকে না। মাতবরের কথা অইল: বিবাদী বলছে ওই ঘটনা : অসম্ভব ভাইরে অসম্ভব বইলা কিছু নাই। মাতবর তাই মেছাল দিচ্ছে : আসমানে কুত্তা ভুকে - আপনেরা রায় শুইনা দাঁত কেলাইয়া হাসছেন। কুত্তা তো আসমানে ভুকে নাইডা হইল সাধারণ সত্য। আর বিশেষ সত্য, ভুকে কেমনে? শোনেন : একবার এক কুড়াল (ঈগল জাতীয় পাখি) একটা কুত্তার বাচ্চারে, ছোঁ মাইরা ধইরা আকাশে উইড়া যায়। কুত্তার বাচ্চাডা হেই অবস্থায় কেঁও কেঁও, ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। কি মিয়ারা আসমানে কুত্তা ভুকবার পারে না?
কেউ কেউ বলে : , পারে। অখন বুঝছি। তাইলে মাতবরের আগের রায়ই ঠিক রইল। ঘটনা অসম্ভব না। এখন শান্তি ধার্য করা হোক। সবাই মাতবরের জয়ধ্বনি দেয়। 
[আমরা গ্রামবাংলার রঙ্গরসিকতার যে গল্প বা গল্পানু বা সিমাসা তুলে আনি তার বেশির ভাগই প্রত্যন্ত গ্রামবাংলায় সফর করে গ্রামীণ রসজ্ঞ প্রবীণ সালিশদারদের ঝুলি থেকে সংগৃহীত রত্নমণিকা। সাধারণ পাঠক এগুলো পড়ে হয়তো শুধু গল্পরসটুকু পেলেন বা ঠাট্টা তামাশা-ব্যঙ্গবিদ্রুপের একটু ঝলক দেখলেন। কিন্তু সচেতন অনুসন্ধিৎসু পাঠক বা এথনোগ্রাফার বা নৃতত্ত্ববিদ পাবেন জার্মান সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক দার্শনিক ইয়োহান হার্ডার যাকে বলেছেন জাতির সাংস্কৃতিক মানসিক আত্মার পরিচয়ঠিক তাই। এগুলো বইপুস্তকে পাওয়া যায় না। কিন্তু কোনো দেশের আবহমানকালের গণমানসিকতা সাংস্কৃতিক পদ্ধতি বোঝার জন্য এসব তুচ্ছ বলে মনে করা ঠিক না। এইসব লোকাল নলেজ বিচার-সালিশ দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য আন রেকর্ডেড উদাহরণ-উপমার গুরুত্ব অনেক।]

1 comment:

Popular Posts