মজার গল্প, উপন্যাস, গোয়েন্দা কাহিনী, ছোট গল্প, শিক্ষামূলক ঘটনা, মজার মজার কৌতুক, অনুবাদ গল্প, বই রিভিউ, বই ডাউনলোড, দুঃসাহসিক অভিযান, অতিপ্রাকৃত ঘটনা, রুপকথা, মিনি গল্প, রহস্য গল্প, লোমহর্ষক গল্প, লোককাহিনী, উপকথা, স্মৃতিকথা, রম্য গল্প, জীবনের গল্প, শিকারের গল্প, ঐতিহাসিক গল্প, অনুপ্রেরণামূলক গল্প, কাহিনী সংক্ষেপ।

Total Pageviews

Friday, July 16, 2021

জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা - সত্যজিৎ রায় - গোয়েন্দা গল্প - Jahangirer Swarnamudra - Satyajit Ray - goyenda golpo (Part 3 of 3)

 

feluda series,feluda samagra,feluda somogro,জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা,সত্যজিৎ রায়,গোয়েন্দা গল্প,Jahangirer Swarnamudra,Satyajit Ray,goyenda golpo

Part 2 link : জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা 

জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা সত্যজিৎ রায় গোয়েন্দা গল্প - Jahangirer Swarnamudra - Satyajit Ray - goyenda golpo (Part 3 of 3)


সিঁদ কাটছে নাকি মশাই? লালমোহনবাবু ফিসফিস্ করে জিগ্যেস করলেন 

আমার দৃষ্টি আবার চলে গেল খুড়ীমার ঘরের দিকে ঘরে একটা টিমটিমে আলো জ্বলছে আওয়াজটা আসছে ওই ঘর থেকেই 

খট খট খট খট ঠং ঠং... 

কিন্তু ওই ঘর ছাড়াও আরেকটা ঘরে আলো জ্বলছে দক্ষিণ দিকের শেষ ঘরটা খোলা জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে একজন লোক দাঁড়িয়ে হাত পা নেড়ে উত্তেজিত ভাবে কথা বলছে 

এবার লোকটা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল

মিঃ কাঞ্জিলাল, বলল ফেলুদা ওটাই শঙ্করবাবুর ঘর

এই মাঝরাত্তিরে কী আলোচনা মশাই? লালমোহনবাবু প্রশ্ন করলেন

জানি না, বলল ফেলুদা ব্যবসা সংক্রান্ত কিছু হবে

আপনাদেরও ঘুম আসছে না?

নতুন গলা পেয়ে চমকে উঠে দেখি ম্যাজিশিয়ান কালীনাথবাবু 

ভদ্রলোক সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন খট খট শব্দটা এখনো হয়ে চলেছে কালীনাথবাবুর ঘাড় ঘুরে গেল সেই দিকে 

কিসের শব্দ বুঝতে পরছেন ? প্রশ্ন করলেন ভদ্রলোক

হামানদিস্তা নাকি? ফেলুদা বলল

ঠিক বলেছেন এই মাঝরাত্তিরে বুড়ি পান ছেঁচতে বসেন শব্দ আগেও পেয়েছি

কথাটা বলে হাতের তেলোর আড়ালে দেশলাই জ্বালিয়ে সিগারেট ধরিয়ে ফেলুদার দিকে একটা সেয়ানা দৃষ্টি দিয়ে বললেন, বনোয়ারিলালের জীবনী লেখার জন্য গোয়েন্দার দরকার হল কেন?  

আমি ! লালমোহনবাবুরও মুখ হাঁ হয়ে গেছে ফেলুদা একটু হালকা হেসে বলল, যাক, অন্তত একজন আমার আসল পরিচয়টা জানে দেখে ভালোই লাগল 

তা জানবে না কেন মিঃ মিত্তির? শর্মা অনেক ঘাটের জল খেয়েছে অনেক কিছু দেখে শুনে চোখ কান দুইই খুলে গেছে  

ফেলুদা একদৃষ্টে চেয়ে আছে ভদ্রলোকের দিকে তারপর বলল, আপনি কি রহস্যই করবেন, না খুলে বলবেন?  

খুলে আর কজনে বলতে পারি মিঃ মিত্তির? স্পষ্টবক্তা আর কজনে হয়? বেশির ভাগই মুখচোরা আর দুঃখের বিষয়, আমিও যে সেই দলেই পড়ি আপনি গোয়েন্দা খুলে বলার কাজ হল আপনার তবে আপনাকে আমি একটা কথা বলতে চাই এখানে এসে আপনার পেশাটাকে কাজে লাগানোর কথা ভুলে যান অমরাবতীতে এসেছেন, দৃদিন ফুর্তি করে গঙ্গার হাওয়া খেয়ে ফিরে যান নইলে বিপদে পড়তে পারেন 

আপনার উপদেশের জন্য ধন্যবাদ

কালীনাথবাবু নিজের ঘরে ফিরে গেলেন

লোকটা অনেক কিছু জানে বলে মনে হচ্ছে? চাপা গলায় বললেন লালমোহনবাবু

একটা জিনিস জানতেই পারে,' বলল ফেলুদা

কী? আমরা দুজনে একসঙ্গে জিগ্যেস করলাম

চুরিটা কে করেছিল যে করেছিল সে তো ওঁর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল  

আমি বললাম, কিন্তু সেটা উনি নিজেও করে থাকতে পারেন উনি হাত সাফাই জানেন  

এগজ্যাক্টলি, বলল ফেলুদা 

 

সাড়ে ছয়টায় বেড টি না দিলে হয়ত ঘুম ভাঙতে আরো দেরি হত, কিন্তু ফেলুদাকে দেখে মনে হল সে অনেকক্ষণ আগেই উঠেছে জিগ্যেস করাতে বলল, শুধু উঠেছি নয়, এর মধ্যে একটা চক্করও মেরে এসেছি  

কোথায়?

শহরের দিকে  

কী দেখলে?

কী দেখলাম না সেটাই বড় কথা

কিছু বুঝতে পারলে?

পানিহাটিতে আসা বৃথা হয়নি এটা বুঝেছি  

লালমোহনবাবু এসে বললেন এমন সলিড ঘুম নাকি ওঁর অনেকদিন হয়নি

খুড়ীমার উঠতে দেরি দেখে তিনিও খুব সলিড ঘুমিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে, বলল ফেলুদা 

আমি বললাম, সেটা আবার কি করে জানলে?

অনন্তকে জিগ্যেস করেছিলাম সে বলল খুড়ীমা এখনো স্নানে যাননি এমনিতে ছটার মধ্যে নাকি ওঁর স্নান সারা হয়ে যায় 

আমরা তিনজন বারান্দায় গিয়ে বসেছিলাম, মিনিট দশেকের মধ্যে শঙ্করবাবু এসে পড়লেন স্নান-টা সেরে ফিটফাট 

আমি কিন্তু ধরা পড়ে গেছি, মিঃ চৌধুরী, বলল ফেলুদা আপনার বাল্যবন্ধু আমায় চিনে ফেলেছেন 

সে কি!

আপনি ঠিকই বলেছিলেন ভদ্রলোক গভীর জলের মাছ

তাহলে কি বলছেন আপনার পরিচয়টা দিয়েই দেব? 

তাহলে কিন্তু সেই সঙ্গে আপনার জানিয়ে দিতে হবে আপনি কেন আমাকে ডেকেছেন অর্থাৎ এতদিন যে কথাটা চেপে রেখেছিলেন সেটা প্রকাশ করতে হবে 

শঙ্করবাবুর কপালে আবার দুশ্চিন্তার রেখা দেখা দিল।। 

পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কাঞ্জিলাল আর কালীনাথবাবু বারান্দায় এসে পড়লেন, আর তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বাইরে একটা গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল কাঞ্জিলাল আর কালীনাথ বারান্দায় রয়ে গেলেন, আমরা চারজন সদর দরজায় গিয়ে হাজির হলাম 

লাল ক্রস-মারা একটা কালো অ্যামব্যাসাডর (গাড়ি) থেকে নামলেন জয়ন্তবাবু আর ডাঃ সরকার জয়ন্তবাবুর মাথার পিছনের চুল খানিকটা কামিয়ে সেখানে প্লাস্টার লাগানো হয়েছে 

জয়ন্তবাবু নেমেই তার দাদার কাছে ক্ষমা চাইলেন–“ভেরি সরি তোমার জন্মতিথিতে এমন একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেললাম আসলে প্রেসারটা... 

কোনো চিন্তা নেই, বললেন ডাঃ সরকার আমি ওষুধ দিয়ে দিয়েছি তবে রোদে বেশি ঘোরাঘুরি চলবে না 

আপনারা চা খাবেন ? বললেন শঙ্করবাবু

তা হলে মন্দ হত না চা পানের সময় পাইনি এখনো 

এরা সব কোথায়? জয়ন্তবাবু জিগ্যেস করলেন

বারান্দায়, বললেন শঙ্করবাবু জয়ন্তবাবু আর ডাঃ সরকার বারান্দার দিকে চলে গেলেন

চলুন, সকলে একসঙ্গেই বসা যাক, ফেলুদার দিকে ফিরে বললেন শঙ্করবাবু 

দাঁড়ান, আগে একটা কাজ সেরে নেওয়া দরকার

ফেলুদা কথাটা বেশ জোরের সঙ্গেই বলল কী কাজের কথা বলেছে ?

কাজ? শঙ্করবাবু একটু যেন অবাক হয়েই জিগ্যেস করলেন 

আপনার খুড়ীমার কাছে সিন্দুকের যে ডুপ্লিকেট চাবিটা আছে সেটা চাইলে পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই 

তা নিশ্চয়ই যাবে, কিন্তু-----

একবার সিন্দুকটা খুলে দেখতে চাই 

খুড়ীমার ঘরে গিয়ে দেখি বুড়ি গামছা নিয়ে স্নানে বেরোচ্ছেন

আজ তোমার এত দেরি?' শঙ্করবাবু প্রশ্ন করলেন

আর বলিস না চোখ মেলে দেখি ঝাঁ ঝাঁ রোদ একেকদিন কী যে হয়!

তোমার চাবিগোছাটা একবার দিতে হবে খুড়ীমা সিন্দুকটা খুলব

কিন্তু তোর কাছে যে? 

আমারটা খুঁজে পাচ্ছি না 

খুড়ীমা আলমারি খুলে চাবির গোছা বের করে দিয়ে চলে গেলেন 

শঙ্করবাবু সিন্দুকের দিকে এগিয়ে গেলেন, আর সেই ফাঁকে কেন জানি ফেলুদা হামানদিস্তাটা হাতে নিয়ে একবার নেড়েচেড়ে দেখল 

সর্বনাশ! 

শঙ্করবাবুর চিৎকারে চমকে লালমোহনবাবু সেলিম আলির বইটা তাঁর হাত থেকে ফেলেই দিলেন 

থলি বাক্স কিছুই নেই, বললে ফেলুদা শঙ্করবাবুর ফ্যকাসে মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছ না 

ওটা বন্ধ করুন, বলল ফেলুদা তারপর চলুন নিচে যাওয়া যাক সত্য উঘাটনের সময় এসেছে আমার আসল পরিচয়টা সকলকে জানিয়ে দিন এবং কতগুলো প্রশ্ন করব সেটাও জানিয়ে দিন 

বুঝতে পারছি শঙ্করবাবুকে অনেকখানি মনের জোর প্রয়োগ করতে হচ্ছে, কিন্তু তিনি গত বছরে চুরির ব্যাপারটা, আর আজ এইমাত্র সিন্দুক খুলে যা দেখলেন সেটা মোটামুটি গুছিয়ে সকলকে বলে বললেন, আমার বাড়িতে আমারই অতিথি হয়ে এসে আমার এত কাছের লোক যে এমন একটা কাজ করতে পারে সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি কিন্তু ঘটনা যে ঘটেছে তাতে কোন ভুল নেই, আর সেই কারণেই আমি কলকাতার স্বনামধন্য ইনভেসটিগেটর প্রদোষ মিত্রকে ডেকেছি এর কিনারা করার জন্য ইনি তোমাদের কয়েকটা প্রশ্ন করবেন আশা করি তোমরা তার ঠিক ঠিক জবাব দেবে 

সকলে চুপ কার মনে কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে দেখে বোঝার উপায় নেই ফেলুদা শুরু করল প্রথম প্রশ্নটা ডাঃ সরকারকে, আর সেটা যাকে বলে অপ্রত্যাশিত

ডাঃ, সরকার, আপনাদের এই পানিহাটিতে কটা হাসপাতাল আছে?

একটাই, বললেন ডাঃ সরকার 

তার মানে সেখানেই আপনি নিয়ে গিয়েছিলেন জয়ন্তবাবুকে, আর সেখান থেকেই কাল রাএে ফোন করেছিলেন? 

হঠাৎ প্রশ্ন কেন জানতে পারি কি? কারণ আজ সকালে আমি সে হাসপাতালে গিয়েছিলাম, জয়ন্তবাবু সেখানে যাননি

ডাঃ সরকার হাসলেন 

কাল রাত্রে যে আমি হাসপাতাল থেকে ফোন করেছিলাম সে কথা আমি শঙ্করবাবুকে বলিনি 

তবে কোত্থেকে করছিলেন? 

আমার বাড়ি থেকে কাল যাবার পথেই জয়ন্তবাবুর জ্ঞান হয় তখন বুঝতে পারি আঘাত গুরুতর নয়, কনকাশন হয়নি তবু একবার দেখব বলে আমার বাড়িতেই নিয়ে যাই তখনই ঠিক করি রাত্তিরটা ওখানে রেখে সকালে পৌঁছে দিয়ে যাব 

এবার জয়ন্তবাবুকে একটা প্রশ্ন, বলল ফেলুদা আপনি কাল যে সিন্দুক খোলার জন্য চাবিটা নিলেন, সেটা আপনার হাতেই ছিল? 

হ্যাঁ, কিন্তু মাথা ঘুরে পড়ার পর আর হাতে নাও থাকতে পারে

হাতে না থাকলেও, কাছাকাছিই পড়ে থাকার কথা কিন্তু তা ছিল না

সেটার আমি কি জানি? চাবি আপনারা খুজে পেলেন কি না পেলেন তার আমি কী করতে পারি? আপনি কী বলতে চাইছেন সেটা সরাসরি বলুন না 

আরেকটা প্রশ্ন আছে, সেটাও ডাক্তারকে তার পরেই সরাসরি বলছি ডাঃ সরকার, হিমোগ্লোবিন বলে একটা পদার্থ আছে সেটা আপনি জানেন নিশ্চয়ই 

কেন জানব না? 

সাধারণ লোকের চোখে সেটার রঙের সঙ্গে রক্তের কোন তফাত ধরা পড়ে না সেটাও নিশ্চয়ই জানেন 

ডাক্তার সরকার গলা খাক্রানি দিয়ে মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানিয়ে দিলেন 

আমার বিশ্বাসটা কী তাহলে এবার বলি? বলল ফেলুদা সকলে একদৃষ্টে চেয়ে আছে ফেলুদার দিকে আমার বিশ্বাস জয়ন্তবাবু অজ্ঞান হননি, অজ্ঞান হবার ভান করেছিলেন ডাক্তার সরকারের সঙ্গে একজোট হয়ে কারন তাদের দুজনের এই বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার দরকার ছিল 

ননসেন্স! চেঁচিয়ে উঠলেন জয়ন্তবাবু কেন, চলে যাব কেন?

কারণ মাঝারাওিরে গোপনে আবার ফিরে আসবেন বলে

ফিরে আসব?’ 

হ্যা! উত্তরের ফটক দিয়ে ঢুকে, পিছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠে আপনার মার, ঘরে যাবেন বলে 

আপনি একটু বাড়াবাড়ি করছেন, মিঃ মিত্তির মাঝ রাত্তিরে মা- ঘরে যাব, আর মা টের পাবেন না? মা রাত্তিরে তিনঘণ্টার বেশি ঘুমোন না সেটা আপনি জানেন? 

এমনিতে ঘুমোন নাকিন্তু ঘুমের ওষুধ খাওয়ালে? ধরুন যদি ডাক্তারবাবু গতকাল তাঁকে দেখার সময় তার দুধভাতে কিছু মিশিয়ে দিয়ে থাকেন? 

জয়ন্তবাবু আর ডাঃ সরকার দুজনেরই ডোন্ট কেয়ার ভাবটা মিনিটে মিনিটে কমে আসছে সেটা বুঝতে পারছি

ফেলুদা বলে চলল, আপনার ফিরে আসতে হয়েছিল কারণ এক বছর আগে যে কাঁচা কাজটা করেছিলেন, এবার আর সেরকম করলে চলত না শঙ্করবাবুর পুরো প্ল্যানটাই ভেস্তে দিয়ে মাঝরাত্তিরে এসে চুরিটা সারার দরকার ছিল সে চুরি ধরা পড়ত কবে তার কোনো ঠিক নেই অবিশ্যি চাবি আপনার কাছে ছিল না, তাই আপনার মা- আলমারি থেকে ডুপলিকেট বার করে নিতে হয়েছিল সেই সময় আমার এই বন্ধুর আবৃত্তি শুনে আপনি কিঞ্চিৎ বিচলিত হয়ে পড়েন তাই গায়ে একটা থান জড়িয়ে দরজার মুখে এসে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে আপনার মা জেগেই আছেন, এভরিথিং ইজ অল রাইট তার পরে আমাদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল করার জন্য হামানদিস্তা পিটতে শুরু করেন এতেও আমার সন্দেহ হয়েছিল, কারণ, হামানদিস্তায় পান থাকলে শব্দটা হয় একটু অন্যরকম; এটা ছিল ফাঁকা শব্দ 

সবই বুঝলাম, মিঃ মিত্তির, বললেন জয়ন্তবাবু, কিন্তু তারপর? 

তারপর চাবি দিয়ে সিন্দুক খোলা

আপনি কোন অপরাধে আমাদের অভিযুক্ত করছেন, মিঃ মিত্তির? অজ্ঞান হবার ভান করা? আমার মাকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া? রাত্তিরে ফিরে এসে ডুপলিকেট চাবি বার করে সিন্দুক খোলা? 

তার মানে এর সবগুলোই করেছেন বলে স্বীকার করছেন ? 

এর কোনোটার জন্য শাস্তি হয় না সেটা আপনি জানেন? আসল ব্যাপারটায় আসছেন না কেন আপনি? 

ঘটনা যে দুটো জয়ন্তবাবু, একটা নয় আগের প্রথম ঘটনাটা সেরে নিইএক বছর আগের চুরি 

সেটা আপনি সারবেন কি করে, মিঃ মিত্তিরঃ আপনি কি অন্তর্যামী? আপনি তখন কোথায়? 

আমি ছিলাম না ঠিকই, কিন্তু অন্য লোক ছিল যিনি চুরি করেছিলেন তাঁর ঠিক পাশেই লোক ছিল তাদের মধ্যে অন্তত একজন কি টের পেয়ে থাকতে পারেন না? 

এবারে শঙ্করবাবু কথা বললেন তিনি বেশ উত্তেজিত 

এটা আপনি কী বলছেন, মিঃ মিত্তির? চুরি হয়েছে সেটা জানবে অথচ আমায় বলবে না, আমার এত কাছের লোক হয়ে? 

ফেলুদা এবার ম্যাজিশিয়ান কালীনাথবাবুর দিকে ঘুরল 

আপনি কাল রাত্তিরে কী বিপদের কথা ভেবে আমাকে তদন্ত বন্ধ করতে বলছিলেন সেটা বলবেন, কালীনাথবাবু? 

কালীনাথবাবু হেসে বললেন, অপ্রিয় সত্য প্রকাশ করায় বিপদ নেই? শঙ্করের মনের অবস্থাটা ভেবে দেখুন ! 

না, নেই বিপদ, দৃঢ়স্বরে বললেন শঙ্করবাবু! অনেকদিন ব্যাপারটা ধামা চাপা রয়েছে এবার প্রকাশ হওয়াই ভালো তুমি যদি কিছু জেনে থাক বলে ফেল কালীনাথ 

সেটা বোধহয় ওঁর পক্ষে সহজ নয়, মিঃ চৌধুরী, বলল ফেলুদা, কারণ তদন্তে চোর ধরা পড়লে যে ওঁরও বিপদ হত এই একটা বছর যে উনি চোরকে নিংড়ে শেষ করেছেন! 

ব্ল্যাকমেল!

ব্ল্যাকমেল! শঙ্করবাবু সেটা উনিও স্বীকার করবেন না, চোরও স্বীকার করবেন না অবিশ্যি চোরের যে দোসর আছে সেটা সম্ভবত কালীনাথবাবু জানতেন না, উনি একজনকেই লক্ষ করেছিলেন কিন্তু আমার ধারণা এই অনবরত ব্ল্যাকমেলিং-এর ঠেলায় দ্বিতীয় চুরিটার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল আর তাই-----

ভুল! ভুল!’ তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন জয়ন্তবাবু সিন্দুক থেকে যা নেবার তা আগেই নেওয়া হয়ে গেছে বনোয়ারিলালের আর একটি জিনিসও তাতে নেই! সিন্দুক খালি!’ 

তার মানে আমার বাকি অভিযোগ সবই সত্যিই?

কিন্তু ... কাল রাত্তিরে কুকীর্তিটা কে করেছে সেটা বলছেন না কেন? 

সেটাও বলছি, কিন্তু তার আগে আপনার স্পষ্ট স্বীকারোক্তিটা চাই আপনি বলুন জয়ন্তবাবু-ডাঃ সরকার আর আপনি মিলে গতবছর বারোটার মধ্যে থেকে একটি স্বর্ণমুদ্রা সরিয়েছিলেন কিনা 

জয়ন্তবাবুর মাথা হেঁট হয়ে গেছে; ডাঃ সরকার দুহাতে রগ টিপে বসে আছেন

আমি স্বীকার করছি, বললেন জয়ন্তবাবু ফেলুদা পকেট থেকে টেপ রেকর্ডারটা বার করে চালু করে আমার হাতে দিয়ে দিল  

আমি দাদার কাছে ক্ষমা চাইছি সে স্বর্ণমুদ্রা ডাঃ সরকারের কাছেই আছে, সেটা ফেরত দেওয়া হবে আমাদের দুজনেরই অর্থাভাব হয়েছিল একটার জায়গায় বারোটার পুরো সেটটা বিক্রি করলে প্রায় একশো গুণ বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছিল, তাই ...

সে লোক চুরিও করতে পারে বলল ফেলুদা! কিন্তু তিনি চুরি করেননি

তাহলে? প্রশ্ন করলেন শঙ্করবাবু

ওগুলো সরিয়েছেন প্রদোষ মিত্র ফেলুদা ঘর থেকে বাকি মাল এনে টেবিলের উপর রাখল সকলের মুখ হা হয়ে গেছে 

এই হল বনোয়ারিলালের বাকি সম্পত্তি, বলল ফেলুদা, মেঝেতে চাবি না পেয়ে এবং রক্তের বদলে হিমোগ্লোবিন দেখে মনে ঘোর সন্দেহ উপস্থিত হয় তাই যখন আপনাকে ধরাধরি করে নিচে নিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন বাধ্য হয়েই আমাকে পিকপকেটের ভূমিকা অবলম্বন করতে হয়েছিল ভাগ্য ভালো যে চাবিটা ছিল আপনার প্যান্টের ডান পকেটে বাঁ পকেটে থাকলে পেতাম না আপনাকে নিয়ে যাবার পর আমরা বৈঠকখানায় এসে বসি তখনই এক ফাঁকে বেরিয়ে গিয়ে আমি সিন্দুক খুলে জিনিসগুলো বার করে আমার ঘরে রেখে দিই আমি জানতাম যে বিপদের আশঙ্কা আছেএই নিন আপনার চাবি, মিঃ চৌধুরী এরপর কী করা হবে সেটা আপনিই স্থির করুন; আমার কাজ এখানেই শেষ 

Tags: feluda series,feluda samagra,feluda somogro,জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা,সত্যজিৎ রায়,গোয়েন্দা গল্প,Jahangirer Swarnamudra,Satyajit Ray,goyenda golpo

No comments:

Post a Comment

Featured Post

মজার গল্প - টেরোড্যাকটিলের ডিম – সত্যজিৎ রায় – Mojar golpo – Pterodactyl er dim - Satyajit Ray

মজার গল্প - টেরোড্যাকটিলের ডিম – সত্যজিৎ রায় – Mojar golpo – Pterodactyl er dim - Satyajit Ray মজার গল্প - টেরোড্যাকটিলের ডিম  – সত্যজিৎ রা...