মজার গল্প, উপন্যাস, গোয়েন্দা কাহিনী, ছোট গল্প, শিক্ষামূলক ঘটনা, মজার মজার কৌতুক, অনুবাদ গল্প, বই রিভিউ, বই ডাউনলোড, দুঃসাহসিক অভিযান, অতিপ্রাকৃত ঘটনা, রুপকথা, মিনি গল্প, রহস্য গল্প, লোমহর্ষক গল্প, লোককাহিনী, উপকথা, স্মৃতিকথা, রম্য গল্প, জীবনের গল্প, শিকারের গল্প, ঐতিহাসিক গল্প, অনুপ্রেরণামূলক গল্প, কাহিনী সংক্ষেপ।

Total Pageviews

Tuesday, August 17, 2021

অনুবাদ গল্প - দ্য ডেভিল অ্যান্ড ডেনিয়েল ওয়েবস্টার - স্টিফেন বেনেট - The devil and Daniel Webster by Stephen Vincent Benet - Bangla

Bangla translation, অতিপ্রাকৃত গল্প, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান, অনুবাদ গল্প,বড় গল্প, বাংলা কৌতুক, The devil and Daniel Webster Bangla, Stephen Vincent Benet

অনুবাদ গল্প -  দ্য ডেভিল অ্যান্ড ডেনিয়েল ওয়েবস্টার - স্টিফেন বেনেট - The devil and Daniel Webster by Stephen Vincent Benet - Bangla

- - - - - - - - - - - -

আমেরিকা, মার্কিন মুলুক-

তার সেরা জায়গা হল নিউ হ্যাম্পশায়ার। অন্ততঃ ড্যানিয়েল ওয়েবস্টারের সেই মত। আর ড্যানিয়েল ওয়েবস্টারের মতের কোন দাম নেই, এ কথা বলবার মত বুকের পাটা আছে কার? ড্যানিয়েল তাকে আস্ত গিলে খাবেন না!

উকিলের মত উকিল বটে ড্যানিয়েল ওয়েবস্টার। সাদাকে কালো বলে, দিনকে রাত বলে প্রমাণ করতে তাঁর জুড়ি কেউ কোনদিন কোন দেশে ছিল না। চেহারা দত্যির মত, গলা বজ্রের মত, হৃদয়টা প্রশান্ত মহাসাগরের মত।

লোকে বলত-ওয়েবস্টারের প্রেসিডেন্ট হওয়া উচিত আমেরিকার। তা তিনি হন নি কখনও, কিন্তু যাঁরা তা হয়েছেন তাকে ডিঙ্গিয়ে, তাঁরা কেউ ওয়েবস্টারের জুতোর ফিতে খোলারও যোগ্য নন। যে কোন দিক দিয়েই বিচার করদেশের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ মানুষ হলেন ওয়েবস্টার। বিদ্যা বল, বুদ্ধি বল, সাহস বল, শক্তি বল, চরিত্র বল, মহত্ত্ব বল --  ওয়েবস্টারই আমেরিকা, আমেরিকাই ওয়েবস্টার।

উকিল তিনি! উকিল! অমন বক্তৃতা করতে ডেমস্থিনিস সিসিরো কোনদিন পারেন নি, পারেন নি এডমান্ড বার্ক বা সুরেন বাঁড়ুজ্যেও। লোকমুখে প্রচার-রাত্রিবেলায় তিনি যদি ছাদে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা শুরু করলেন, আকাশে ফুটে উঠল জাজ্বল্যমান হয়ে মার্কিন পতাকার তারা এবং ডোরা। একবার একটা নদীর বিরুদ্ধে বক্তৃতা শুরু করলেন, নদীটা ভয় পেয়ে মাটির তলায় সেঁধিয়ে গেল।

কথায় কথা আসে। নদীর কথা যখন উঠল, ওয়েবস্টারের মাছ ধরার কথাও না বললে নয়। ছিপ হাতে করে তিনি নদীর ধারে এলেন যদি, আধ মণ এক মণ ওজনের ট্রাউটগুলো লাফিয়ে তাঁর পকেটে উঠল, ওয়েবস্টারের হাত থেকে নিস্তার যখন নেই-, মিছে কেন প্রাণ বাঁচাবার জন্য ঝামেলা করা।

হ্যা, উকিল বটে একখানি। কত মামলা যে জিতেছেন! কিন্তু সবসেরা মামলা যা তিনি লড়েছিলেন, তা হল জ্যাবেজ স্টোনের হয়ে শয়তানের সঙ্গে লড়া। খোদ শয়তান! যার কাজ হল লোভানি দিয়ে দিয়ে মানুষের আত্মা কিনে নেওয়া আর অনন্তকাল সেই সব আত্মাকে নরকের আগুনে পোড়ানো।

সেই শয়তান! জ্যাবেজ স্টোনের আত্মাটি গ্রাস করতে এসে বাছাধন পড়ে গেলেন ওয়েবস্টারের পাল্লায়। শেষকালে ছেড়ে-দে-মা-কেঁদে-বাঁচি অবস্থা। নাকে খত দিয়ে পালাতে পথ পান না। সেই থেকে নিউ হ্যাম্পশায়ারে আর শয়তানের প্রবেশাধিকার নেই। একরারনামা লিখে দিয়ে গিয়েছে যে ওয়েবস্টারের জন্মস্থান নিউ হ্যামশায়ারের চতুঃসীমায় সে পা ফেলবে না কোনদিন।

হ্যা, ঐ জ্যাবেজ স্টোনের কথা। হয়েছিল কী, জানো? ক্রশ কর্নারে বাড়ি জ্যাবেজ স্টোনের। গরিব চাষী। লোক এমন কিছু মন্দ ছিল না, কিন্তু বরাত তার খারাপ। চিরদিনই খারাপ। গম যদি বুনল, পোকা লেগে গাছ ঝাজরা করে দেবে। আলু যদি বসাল, ধসা লেগে গাছ ক্ষয়ে যাবে। জমি তার কম ছিল না, কিন্তু হল না কিছু তা থেকে। পড়শীর জমিতে যদি পাথর বার হয় দুখানা, জ্যাবেজের জমিতে বেরুবে দুটো পাহাড়। ঘোড়ার হাঁটুতে বাত দেখে সেটা বেচে দিল জ্যাবেজ। যেটা তার বদলে কিনে আনল, সেটায় বেরুলো শিরদাঁড়ায় ঘা।

মন্দ বরাত নিয়ে কিছু লোক তো জন্মাবেই, সেটা এমন-কিছু শোরগোল করার মত ব্যাপার নয়। জ্যাবেজও করে নি শোরগোল এতদিন। কিন্তু অবশেষে মেজাজ তার বিগড়ে গেল একদিন।

সকালবেলায় জমিতে লাঙ্গল নামিয়েছে, এক চাঙ্গড় পাথর ছিল মাটির তলায়, মট করে লাঙ্গলের ফলাটি দুখানা। অথচ কালও এইখানেই এই লাঙ্গলেই চষেছে জ্যাবেজ, এখানে যে পাথর ছিল না কাল, তা সে যে জিনিসের বল না কেনো তার কসম খেয়ে বলতে পারবে।

ভাঙ্গা লাঙ্গলের দিকে হতাশ নয়নে তাকিয়ে আছে জ্যাবেজ, একটা ঘোড়া আবার শুরু করল কাশতে। শুকনো কাশি, সবগুলো পাঁজরার হাড় যে-কাশিতে নাগরদোলার বাক্সর মত ওঠে আর নামে, ডাক্তারকে বিলক্ষণ কিছু না দিলে সে-কাশি সারে না কক্ষণো।

কথায় কথা আসে। এক দুঃখে ভুগতে ভুগতে অন্য দুঃখের কথা মনে পড়ে। বাড়িতে বৌয়ের অসুখ, কী অসুখ তা শুনতে পায় নি স্টোন। দুটো ছেলেরও অসুখ-অসুখটা যে হাম, তা শুনেছে স্টোন। নিজের একটা আঙ্গুলে এদিকে আঙ্গুলহাড়া, বেগুনের ভিতরে আঙ্গুল ঢুকিয়ে বসে আছে স্টোন। এই নানান দুঃখের উপরে টেক্কা দিয়ে এই সুপ্রভাতে নতুন এবং চরম দুঃখ এল--- লাঙ্গলখানা ভেঙ্গে ফেলেছে স্টোন।

চারদিকে একবার চোখটা বুলিয়ে নিয়ে এল স্টোন, বোধহয় দেখে নিল দুঃখের এই ঘনঘটায় কোন দিকে কোথাও একটা রূপোলী রেখার আভাস চোখে পড়ে কি না। নাঃ, তা পড়ে না। হতাশ হয়ে সে বলে উঠল—“এইরকম কোণঠাসা হয়েই মানুষ শয়তানের কাছে নিজেকে বিক্রি করে দেয়। আমিও দেব! আমিও দেব।

কথাটা মুখ থেকে বেরুবার সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু গা-টা সিরসির করে উঠল স্টোনের। এ কী কথা সে বলে ফেলল হঠাৎ! অত্যন্ত বেফাঁস, বেয়াড়া, সাংঘাতিক কথা যে! কিন্তু তার পরই কয়েকবার বুকে চাপড় মেরে তাল ঠুকল সে-যা বলেছি তা বলেছি, নিউ হ্যামশায়ারের লোক কথা ফেরায় না। মরদকা বাৎ, হাতীকা দাঁত! (পুরুষ মানুষের কথা, হাতীর দাঁতের মত)

সারাদিন ভয়ে ভয়ে কাটল। সত্যি সত্যি শয়তান শুনে ফেলে নি তো ঐ বেফাস কথাটা? সত্যি সত্যি সে হাজির হবে না তো, কথামাফিক চুক্তিনামা লিখিয়ে নেবার জন্য?

কিন্তু সারাদিনের ভিতর কেউ এল না। ভয়টা আস্তে আস্তে কাটছে স্টোনের। অমন কত জনে কত কথা হরদম তো বলেই যাচ্ছে। শয়তান ব্যস্ত লোক, ত্রিভুবন এ বেড়াতে হয় তো তাকে বিভিন্ন কাজকর্ম উপলক্ষে! সব কথায় কান দেওয়া কি তার পক্ষে সম্ভব নাকি?

পরের দিন ও কথা সে প্রায় ভুলেই গিয়েছে, নতুন লাঙ্গল কেনার পয়সা কোন দিক থেকে কোন ফিকিরে জোটানো যায়, সেই কথাই ভাবছে ক্রমাগত এমন সময় সন্ধ্যার ঠিক পরে, সবাইকে নিয়ে জ্যাবেজ যখন খেতে বসবে-বসবে ভাবছে, ঠিক সেই সময় একখানা ছিমছাম বগি গাড়ি এসে দাঁড়াল তার দরজায়—“স্টোন মশাই বাড়িতে আছেন?”—অতি মোলায়েম স্বরে প্রশ্ন এল বগির ভিতর থেকে।

হ্যা, আছেন বইকি! স্টোন মশাই ভয়ে স্টোনে পরিণত হবার দাখিল হলেও বাড়িতেই আছেন সশরীরে। না থেকে আর যাবেন কোন্ চুলোয়? বগি থেকে কে যে (শয়তান) ডাকছে, তা বুঝতে এক সেকেণ্ডও দেরি হয় নি স্টোনের। বৌকে বলল---ও একটা উকিল, এক আত্মীয়ের উইলের দরুন কিছু টাকা আমার পাবার কথা। সেই আলোচনা করতেই এসেছে

বগি থেকে লোকটি নামল--কালো পোশাক গায়ে, ঝকঝকে সাদা দাঁত, দাঁতের আগা সূচালো সরু নাকি? লোকটি এসে নামতেই বাড়ির কুকুরটা তাকে একনজর দেখে নিয়েই কেঁউ কেউ করে পালাল, দুই পায়ের ভিতরে লেজ লুকিয়ে।

এই কুকুরের আচরণটাই জ্যাবেজ স্টোনের চোখে সবচেয়ে অর্থব্যঞ্জক মনে হল। কিন্তু কী আর করা যাবে? কথা সে নিজেই দিয়েছে নিউ হ্যামশায়ারের মানুষ কথা ফেরায় না কখনও, শয়তানের ভয়েও না। বাড়ির ভিতরে বসবার জায়গা ছিল বইকি! কিন্তু জ্যাবেজ চলে গেল বাড়ির পিছনদিকে গোলাবাড়িতে। সেইখানে বসে চুক্তিনামা সই হল, দলিল আগন্তুক লিখেই এনেছিল। কিন্তু সই করবার কালি সে আনে নি। একটা রূপোর পিন দিয়ে সে স্টোনের হাতে খোঁচা দিল একটা, রক্ত বেরুলো কয়েক ফোটা, সেই রক্তেই সই হল দলিল।

এর পর থেকে দুদ্দাড় করে উন্নতি হতে লাগল স্টোনের অবস্থার। গরুগুলো মোটা হয়ে উঠল, ঘোড়াগুলোর গা দিয়ে যেন তেল চোয়াতে লাগল। ফসল যা ফলতে লাগল তার ক্ষেতে, পড়শীরা হিংসেতে ফেটে মরবার যোগাড়। একবার বাজ পড়ে আশেপাশে কয়েকটা গোলা পুড়ে গেল, জ্যাবেজ স্টোনের গোলাটি কিন্তু রয়ে গেল অক্ষত। দুবছরের ভিতরেই জেলার বড়লোকদের মধ্যে গণ্যমান্য হয়ে উঠল জ্যাবেজ। তাকে সেনেটের সদস্য করবার জন্য উঠে পড়ে লেগে গেল একদল লোক। স্টোন পরিবারের ছেলে-বুড়ো সবার যেন কাঁধে কাঁধে পাখা গজিয়েছেএমনিভাবে তারা উলটি-পালটি চক্কোর খেতে লাগল স্ফূর্তির হাওয়ায়।

স্ফুর্তি অবারিত, স্ফুর্তি উদ্দাম। সকলেরই। একমাত্র জ্যাবেজ স্টোনের ছাড়া। সাত বছরের মেয়াদ। প্রতিবছরই একবার করে এসেই কালো-পোশাক-পরা সুচালো-দাঁতওয়ালা আগন্তুকটি দেখা দিয়ে যায় স্টোনকে। বাড়ির সামনে দিয়ে খটাখট শব্দে চলে যায় বগির ঘোড়ারা, আগন্তুক মুখ বাড়িয়ে একবার দেখে নেয় স্টোনের মুখখানা। নামে না কোনবার, কিন্তু ষষ্ঠ বৎসরে সে না

বগি একটু দূরে রেখে ছড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে সে মাঠের ভিতর দিয়ে আসছে, বগলে একটা কালো ব্যাগ। স্টোন তাকে নামতে দেখেই এগিয়ে গেল, দেখা করল মাঠের মাঝখানেই। আর এক বছরআগামীবারে আমি যখন নামব----

তখন আমার সঙ্গে তোমাকেও যেতে হবে-একথাটা আর মুখ ফুটে বলতে হল না আগন্তুককে, তার চোখের কোণের ধূর্ত হাসিই প্রাঞ্জলভাবে সে কথা বুঝিয়ে দিল স্টোনকে স্টোন হাত কচলাতে লাগল--আর কিছু সময়! আর কিছু সময়! সবে সে গুছিয়ে বসেছে, সবে সেনেটের জন্য নাম উঠেছে তার, এক্ষুণি তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া কি একান্তই নিষ্ঠুরতা নয়? বনেদী পরিবারের লোক আপনি, মাইকেল (হজরত মিকাইল আ.), ইসর‍্যাফেল (হজরত ইসরাফিল আ.) গ্যাব্রিয়েলেদের (হজরত জিবরাঈল আ.) সমগোত্র, দয়ার প্রত্যাশা আপনার কাছে করব না তো কি এ--এই সব পাদরীদের কাছে করব?

জ্যাবেজ পাদরীদের খেলো করে দেওয়াতেই বোধহয় একটু খুশী হল আগন্তুক। আর তিন বছর সময় দিতে রাজীও হল। কিন্তু আরোপ করল নতুন সব শর্ত, আগের চেয়েও কড়া শর্ত সব। জ্যাবেজ নিরুপায়। সময় চাই। যে কোন শর্তে। সে রাজী হয়ে গেল। ব্যাগ খুলে দলিল বার করল আগন্তুক। আর ব্যাগ খোলা পেয়েই তার কোন এক গোপন খুপরি থেকে বেরিয়ে পড়ল একটা জীব, দেখতে একটা ময়লা রঙের প্রজাপতিরই মত, কিন্তু সে কথা বলছে মানুষের স্বরে। হ্যা, যত ক্ষীণ, যত অস্পষ্টই হোক, সে-স্বর যে মানুষেরই, তাতে জ্যাবেজ স্টোনের এতটুকুও সন্দেহ নেই।

পোকাটা বলছে—“বন্ধু জ্যাবেজ! বাঁচাও ভাই, বাঁচাও আমায়, উদ্ধার কর, উদ্ধার কর

কী সর্বনাশ! এ স্বর যে সত্যিই চেনা! এ স্বর তো নির্ঘাত কঞ্জুস স্টিভেন্স-এর! পোকার ভিতর থেকে স্টিভেন্স-এর গলার স্বর শোনা যায় কেন?

দলিলটা মোটামুটি দেখে নিয়ে এদিকে আগন্তুক বলছে- এ তো ঠিকই আছে, দেখলাম। সাত বছরের চুক্তি হয়েছিল, এক বছর তার বাকী। তবে তিন বছর না হয় বাড়িয়েই দিলাম মেয়াদটা। বন্ধুলোকের অনুরোধ রাখতে হয় বইকি।

কিন্তু জ্যাবেজের দৃষ্টি তখন প্রজাপতির দিকে, সেটা উড়ে বসার চেষ্টা করছে জ্যাবেজেরই কাধে। আগন্তুক খপ করে তাকে ধরে ফেলল, আর সঙ্গে সঙ্গে পুরে ফেলল ব্যাগে আবার আর বলল, স্টিভেন্স লোকটা ডাহা ফঁকিবাজ ছিল জীবনে, মৃত্যুর পরেও সে-স্বভাব যায় নি। শয়তানকে কেমন ফাকি দিয়ে পালাবার ফিকিরে ছিল!

মৃত্যু? কিন্তু স্টিভেন্স তো মরে নি ক্ষীণকণ্ঠে প্রতিবাদ করল জ্যাবেজ স্টোন।

মরে নি? ঐ শোনো!

স্টোন কান খাড়া করতেই শুনল উত্তর দিক থেকে গির্জার ঘণ্টা বাজছে বটে। এ সময়ে ঘন্টা বাজা, তার মানেই কোন খ্রীষ্টানের মৃত্যু ঘোষণা করা--

জ্যাবেজের কপালে ঘাম দেখা দিলতার নিজের অদৃষ্টেও (ভবিষ্যৎ) তো ঐ আছে। ব্যাগের ভিতর পোকা হয়ে বন্দী থাকাআর মাত্র তিন বছর পরেই

আগন্তুক ওর মনের কথা বুঝল, দাঁত বার করে হেসে বলল-না, তোমার জন্য আমি একটা বড়সড় বাক্স আনব এখন, ব্যাগের চাপাচুপির ভিতর রাখব না তোমায়। তা ব্যাগই বল, বাক্সই বল, এসব তো ক্ষণস্থায়ী বাসস্থান! পাকাপাকি থাকার ব্যবস্থা তো সকলেরই এক জায়গাতেই। খাসা জায়গা সে! শীতে গ্রীষ্মে সমানভাবে আগুন জ্বলছে দাউদাউ করে

আগন্তুক চলে গেল আর একটা সই নিয়ে। তিন বছর? কতক্ষণ আর? জ্যাবেজের তো মনে হল তিন মিনিট মাত্র!

কত নাম হয়েছে এই তিন বছরে, সেনেটের সদস্য হয়েছে জ্যাবেজ, আগামী নির্বাচনে গভর্নর হওয়ারও খুব সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু সবই তো ফাঁকিবাজি! আর কয়টা দিন বাকী? হিসাব করতে গেলে ভয় করে--

কিন্তু নিউ হ্যাম্পশায়ারের লোক, ভয় পেলেও নিশ্চেষ্ট থাকে না। স্টোন একদিন চলে গেল ড্যানিয়েল ওয়েবস্টারের বাড়ি। ড্যানিয়েলও নিউ হ্যাম্পশায়ারের লোক, নিজের এলাকার লোককে সে প্রাণ দিয়ে ভালবাসে। আর এই শয়তানের ফাঁদ থেকে কোন মানুষ যদি তাকে উদ্ধার করতে পারে হয়তো পারবে ঐ ড্যানিয়েলই।  

নির্দিষ্ট দিনে সন্ধ্যার পরেই গোলাবাড়িতে এজলাস সাজিয়ে বসে আছেন উকিল ওয়েবস্টার। তার পিছনে ভয়ার্ত বিড়ালছানার মত কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে জ্যাবেজ স্টোন। ব্যাগ বগলে করে আগন্তুক এসে ঢুকল। ড্যানিয়েলকে দেখেই হাসি-হাসি মুখখানা কালো হয়ে গেল তার—“এ কী? মামলা হবে নাকি? প্রশ্ন করল বিদ্রুপের সুরে।।

ড্যানিয়েল বললেন-তা তো হবেই। মার্কিন নাগরিক জ্যাবেজ স্টোন, তাকে ধরে নিয়ে নিজের রাজ্যে আগুনে নিক্ষেপ করা, এ তো সামান্য ব্যাপার নয় একটা। এদেশে আইন বলে একটা জিনিস আছে। অন্য কোন দেশের আইন এদেশে অচল।

এদেশের আইন কি এই কথা বলে যে চুক্তি করে সে-চুক্তি খেয়ালখুশীমত ভঙ্গ করা যায়? বলে আগন্তুক—“এই দেখ দলিল, চুক্তির ভাষা সরল এবং স্পষ্ট। নীচে জ্যাবেজ স্টোনের স্বাক্ষর

হ্যা, ভাষার দিক দিয়ে চুক্তিতে কোন গোল নেই জবাব দেন ওয়েবস্টার--- আমার বক্তব্য এই যে চুক্তির বিষয়বস্তুটাই এদেশের আইনে নিষিদ্ধ। যা হোক সে বিচার করবেন জুরি এবং জজ। তুমি যাকে খুশি তাকে জুরিতে আনতে পার, মোদ্দা তাদের মার্কিন নাগরিক হওয়া চাই।

আগন্তুক সেঁতে হাসি হেসে বলল—“মার্কিন নাগরিকই পাবে তুমি। আমার রাজ্যে মার্কিন নাগরিকের অভাব নেই।

জ্যাবেজ স্টোন আর জ্যাবেজ স্টোনের ভিতরে নেই। তার চোখের সামনে একে একে এসে আবির্ভূত হচ্ছে সর্বযুগের মার্কিন পাষণ্ডদের ছায়ামূর্তিরাওয়াল্টার বাটলার, সাইমন গার্টি, কিং ফিলিপ, পাদরী জন স্মিট- আমেরিকার ইতিহাসে জনে জনে যারা কুখ্যাত হয়ে আছে পাপ আর নিষ্ঠুরতার জন্য। ঠিক বারো জনই এসে বসল জুরি হয়ে।

জজ নির্বাচিত হলেন হ্যাথোর্ন, সালেম শহরের বিচারে যিনি ডাইনী বলে পুড়িয়ে মেরেছিলেন বাইশটা মার্কিন রমণীকে।

আগন্তুক হেসে বলল—“ওয়েবস্টার মশাই, জজ আর জুরি দেখে খুশী তো?

অখুশী হওয়ার কিছু নেই, বললেন ওয়েবস্টার ওঁরা একদিন মার্কিন নাগরিক ছিলেন তো! তাহলেই হল! আমি ওঁদের নাগরিক বুদ্ধির কাছে বিচার চাইব। সে বুদ্ধি জাগিয়ে তুলতে না পারি যদি, সে আমার অক্ষমতা---

ওয়েবস্টার একবার তাকিয়ে দেখলেন ভাল করে। তেরোটা ছায়ামূর্তির চোখে নরকের আগুন জ্বলছে লেহি-লেহি করে। হিংসা আর ক্রোধ ফেটে বেরুচ্ছে তা থেকে। এদের কাছ থেকে করুণা প্রত্যাশা করা কি মূর্খতা নয়?

কিন্তু চেষ্টা তো করতেই হবে। নিজের রণকৌশল স্থির করে ফেললেন ড্যানিয়েল। হিংসা দিয়ে হিংসাকে দমন করা যাবে না, ক্রোধ দিয়ে শান্ত করা যাবে না ক্রোধীকে। ওদের হৃদয় গলাতে হবে নিজে কোমল হয়ে, দয়া ধর্ম পবিত্রতার দোহাই দিয়ে। হোক ওরা নারকী আজ! একদিন তো মানুষ ছিল! মানবতা হয়ত চাপা ছিল, ফুটবার সুযোগ পায় নি ওদের চরিত্রে। আজও যদি বেঁচে থেকে থাকে সে-মানবতা, যদি তাকে জাগিয়ে তোলা যায়

সেই চেষ্টাই শুরু করলেন ড্যানিয়েল। কথা কইতে শুরু করলেন স্নিগ্ধ স্বরে। ইচ্ছামত গলার সপ্তসুর খেলাবার বিদ্যে তাঁর আয়ত্ত ছিল। সে-গলায় এখন ফুটতে লাগল যেন ভোরের পাখীর কাকলি, শান্ত সন্ধ্যায় সিন্ধুবেলায় উর্মিবিভঙ্গের মৃদু কল্লোল, ক্রোড়ের শিশুকে দোলা দেবার সময় মায়ের মুখের ঘুমপাড়ানিয়া গান! দয়ার কথা, শান্তির কথা, মেহ বাৎসল্য বান্ধবতার অমৃতগাথা তিনি শোনাতে লাগলেন জ্যাবেজ স্টোনকে কেন্দ্র করে করে। এই দরিদ্র কৃষক হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও তার দুর্ভাগ্যকে জয় করতে পারে নি, পারে নি সন্তানগুলিকে পেট ভরে খেতে দিতে। সে যদি নিজের অবস্থা ভাল করে তুলবার চেষ্টায় একটা ভুলই করে থাকে, মানবতার বিচারশালায় কি তার ক্ষমা নেই?

কথা শুনতে শুনতে নারকী ছায়ামূর্তিদের জ্বলন্ত চোখ কোমল হয়ে এল, অশ্রুবাষ্পে ঝাপসাও হয়ে এল অনেকের দৃষ্টি। তারা একবাক্যে রায় দিল—“জ্যাবেজ অঋণী।

শয়তান পরাস্ত হল উকিলের কাছে।

No comments:

Post a Comment

Featured Post

সুইসাইড – থ্রিলার গল্প - রবিন জামান খান – Suiside - Thiller story Bangla

  Thiller story Bangla,থ্রিলার গল্প, সুইসাইড সুইসাইড – থ্রিলার গল্প - রবিন জামান খান – Suiside - Thiller story Bangla দৌড়াতে দৌড়াতে মি...