মজার গল্প, উপন্যাস, গোয়েন্দা কাহিনী, ছোট গল্প, শিক্ষামূলক ঘটনা, মজার মজার কৌতুক, অনুবাদ গল্প, বই রিভিউ, বই ডাউনলোড, দুঃসাহসিক অভিযান, অতিপ্রাকৃত ঘটনা, রুপকথা, মিনি গল্প, রহস্য গল্প, লোমহর্ষক গল্প, লোককাহিনী, উপকথা, স্মৃতিকথা, রম্য গল্প, জীবনের গল্প, শিকারের গল্প, ঐতিহাসিক গল্প, অনুপ্রেরণামূলক গল্প, কাহিনী সংক্ষেপ।

Wednesday, April 8, 2020

হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা - হায়াৎ মামুদ - Pied Piper of Hamelin – Bengali Translation

হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা - হায়াৎ মামুদ - Pied Piper of Hamelin  Bengali Translation (Part 1 of 2)

হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা - হায়াৎ মামুদ - Pied Piper of Hamelin Bengali Translation (Part 1 of 2)
রোজই এরকম ঘটতে লাগল। দিনের-পর-দিন, রাতের-পর-রাত।
সকাল হয়েছে এইমাত্র। রাস্তায় দু-একজন লোক দেখা যাচ্ছে। এডিথ তড়াক করে লাফিয়ে বিছানা, থেকে নামতে গেল। কিন্তু এ কী! পা পড়ল কিসের উপর? নরম, গোলগাল জ্যান্ত যেন কিছু। ভালো করে দেখতেই ভয়ে ও ঘেন্নায় শিউরে উঠে চেঁচাতে লাগল, মা, মা, শিগগির এসো। পায়ের নিচে পড়ে থেঁতলে চেপ্টে আছে একটা ইঁদুর। এইটাই হল আসল যন্ত্রণা। ইঁদুরের উৎপাতে আর টেকা যাচ্ছে না। শয়ে শয়ে, লাখে লাখে কোথেকে রাজ্যের ইঁদুর এসে সারা শহর ভরিয়ে ফেলল। এক-পা চলতে যাও, একটা-না-একটা ইঁদুরের সঙ্গে দেখা তোমার হবেই। আলমারির ভিতরে জামা-কাপড় রাখা আছে, তুমি একটু বের হবে বলে কাপড় বের করতে গেছ যেই, অমনিবাপরে! বলে লাফিয়ে উঠল একটা ধেড়ে ইঁদুর! অথবা ধরো, দিব্যি বাবু সেজে কোট-প্যান্ট পরে রাস্তায় বেরিয়েছ, মাঠের দিকে একটু ঘুরে আসবে, বিকেলে একটু হাওয়া খাবে। রুমাল বের করতে পকেটে যেই হাত দিয়েছ, সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠলে। ইঁদুরে কামড়ে দিয়েছে। কোটের পকেটে দিব্যি আরামে শ্রীমান ঘুমিয়ে ছিল এতক্ষণ।
এরকম হাজার হাজার ঘটনা রোজই ঘটতে লাগল। এতটুকু নিস্তার নেই এই আপদগুলোর হাত থেকে। কী বিপদ যে হয়েছে! ঘরে কিচ্ছুটি রাখবার জো নেই, সব তছনছ করে দিচ্ছে কেটেকুটে। খাবার ঘরে দুধ, মাংস, ডিমকিছুই হাঁড়িতে, আলমারিতে থাকছে না; দল বেঁধে সব আসছে আর খেয়ে যাচ্ছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার বটে! কিন্তু কী সাংঘাতিক! একদিন তো তারা একটা কুকুরকেই আক্রমণ করে বসল। এমন কথা শুনেছ কোনোখানে যে, ইঁদুরের দল কুকুরকে তাড়া করে নিয়ে বেড়াচ্ছে! আরেক দিন কী হল বলি। ভাড়ার ঘর থেকে দুধ চুরি করতে গিয়ে দ্যাখে, এক হুলোবেড়াল আগেই ভাগ বসিয়েছে সেই দুধে। আর যায় কোথা! সব ইঁদুর একজোট হয়ে বেচারা বিড়ালটাকে মেরেই ফেলল। শেষকালে, এইসব অঘটন ঘটার ফলে অবস্থাটা এমন দাঁড়াল যে, কুকুর-বিড়ালরা আর ঘর থেকে বের হতে চায় না, ইঁদুরের ভয়ে এককোণে চুপচাপ বসে কেবলই ঝিমুতে লাগল।
সত্যি বলতে কী, কেউ রেহাই পেল না এই দস্যি ইঁদুরগুলোর হাত থেকে। তারা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাত থেকে দিব্যি খাবার কেড়ে নিয়ে খাচ্ছে, দরকার হলে এমনকি তাদের আঁচড়ে, কামড়ে দিচ্ছে। ছেলেমেয়েরা যে একটু নিশ্চিন্তে আরাম করে শুয়ে ঘুমুবে তার জো নেই; তাদের দোলনায় শুয়ে ঘুমুতে লাগল ইঁদুরেরা দল বেঁধে। লোকজনের টুপির মধ্যে মহানন্দে এরা আস্তানা বাঁধে। এদের কিচমিচ চেঁচামেচিতে কান ঝালাপালা বাড়ির লোকদের, দু-দণ্ড বসে কেউ আলাপ করতে পারে না। যত্রতত্র ইঁদুরের উৎপাতে শান্তি নেই কোথাও। টেকা যায় না বাড়িতে এদের জ্বালায়, অফিস-আদালতেও একই অবস্থা; যন্ত্রণা সর্বত্র, এতটুকু শান্তি নেই কোনোখানে।
সারা শহরের লোকের সে কী দুর্দশা! অথচ তাদের শহরের মতো সুন্দর শহর আর কোথা? হ্যামেলিন, কী সুন্দর তুমি! বিশাল দেশ জার্মানি। তারই উত্তর-পশ্চিমে এই শহর। পশ্চিমপ্রান্তে বয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছ পানির হেসার নদী। আর দূরে পর্বত। ছবির মতো সুন্দর শহর হামেলিন।
সেদিন সভা বসল শহরে। না-বসে উপায় নেই, অনেক সহ্য করা গেছে, আর পারা যায় না, এবার হেস্তনেস্ত একটা করে ফেলতেই হয়। নগরের পৌরসভার অধিকর্তা মেয়র সভা ডেকেছেন। গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সকলেই এসেছেন। আজ সভাতেই ঠিক হবে, কী করা যায় এই উৎপাতের, ইঁদুরের বংশ নির্বংশ করা যায় কোন উপায়ে।
চেয়ারে বসে আছেন মেয়র। দুশ্চিন্তায় মাথা বোঁ-বোঁ করে ঘুরছে। কীই বা করবেন তিনি? ইঁদুরের বিরুদ্ধে কী করে লড়াই শুরু করবেন ভেবেই পাচ্ছেন না। সভাকক্ষের বাইরে নগরবাসী সব জড়ো হয়েছে। তারা অধৈর্য হয়ে হট্টগোল, চেঁচামেচি করছে। সমাধান একটা খুঁজে বের করতেই হবে, নইলে অপমানের কিছু আর বাকি থাকবে না আজ। সভা আরম্ভ হল। বেচারা মেয়র। চিন্তায় মাথার ঠিক নেই, গলা কাঁপছে। উঠে দাঁড়ালেন, তারপর ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন, গলা বসে যাচ্ছে, কণ্ঠস্বর কাঁদো-কাঁদো : বন্ধুগণ, বড়ই দুর্ভাগ্য আমার যে, আজকে আমি এখানে। মনে হচ্ছে, এই শহর থেকে, এই সভা থেকে যদি দূরে থাকতে পারতাম! কী ভালোই না হত তাহলে! এই জ্বালা আর সহ্য হয় নাএই দায়িত্ব আর তারই মধ্যিখানে হঠাৎ করে এই বিপদ। আপনারা তো আমার কেবল দোষই দেখে বেড়ান, আমি নাকি কিছুই করছি না। আমার মাথা ভাঙবার জন্য সবাই তৈরি হয়ে আছে, আমি জানি। মাথা ভাঙা তো সোজা ব্যাপার। উহ্, আবার দেখছি মাথা ধরল আমার , মাথা ছিড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। এই পর্যন্ত বলে থামলেন মেয়র। দুহাতে কপালের রগদুটো চেপে ধরে রইলেন মিনিট-দুয়েক। তারপর ফের শুরু করলেন—“হ্যা, যা বলছিলাম, মাথা ভাঙা খুব শক্ত ব্যাপার নয়, ইচ্ছে করলেই ভাঙতে পারবেনমাথাটা তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না, কাধের উপরই আছে। কিন্তু উপায় কিছু একটা বাৎলান তো দেখি! আপনারাও তো নিশ্চয়ই ভাবনাচিন্তা করছেন এ নিয়ে, কী করা যায় এ সমস্যার। আপনারাই বলুন কিছু। আমি আর ভাবতে পারছি না, মাথা ঘুরছে আমার। উহ, কেবল একটা যাঁতিকল, যাঁতিকল; কত চেষ্টাই যে করলাম একটা উপায় বের করতে, কিন্তু বৃথাই, বৃথাই সব চেষ্টা। এখন, শুনলে আপনারা বিশ্বাস করবেন না যে, কোনো একটা শব্দ শুনলেই বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটে, মনে হয়এই বুঝি ইঁদুর আসছে। এই বলে বসে পড়লেন মেয়র সাহেব। একসঙ্গে এত কথা বলায় ক্লান্ত তিনি; এখন বসে বসে ঝিমুতে লাগলেন। সভাকক্ষ একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল, টু-শব্দ নেই কারো মুখে, সুচ পড়লেও শব্দ শোনা যাবে এরকম নীরবতা। মাথায় হাত দিয়ে সকলেই ভাবতে লাগলেন। ভাবছেন তো ভাবছেনই, কেবলই ভাবছেন, কিন্তু সমস্যা সমাধানের কোনো হদিশ পাচ্ছেন না।
এমন সময়, হঠাৎটুক টুক টুক টুক! কিসের শব্দ? কান খাড়া করে শুনলেন সকলে। মেয়রের ঝিমুনি ছটকে সরে গেল, উত্তেজনায় তিনি খাড়া হয়ে বসলেন। এ্যা, ইঁদুর, ইঁদুর নাকি? না তো। আবার শব্দ : টুক, টুক। ঠিক দরজার বাইরে; দরজার উপরে যেন কেউ টোকা দিচ্ছে।
কে? এসো, ভিতরে এসো। সন্দিগ্ধভাবে ভীরু হেঁড়ে গলায় হাঁক দিলেন মেয়র। আর তখনি দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল সে। তার চেহারা আর পোশাক-আশাক দেখে চোখ গোল হয়ে গেল সকলের। আসলেই, দেখতে সে বেশ অদ্ভুতই বটে! রোগা, ঢ্যাঙা। একমাথা উষ্কখুষ্ক চুল, কতদিন-যে তেল পড়েনি, চিরুনির ছোঁয়া পায়নি কে জানে, উড়ছে। দাড়িগোঁফ কিচ্ছু নেই। গায়ের রং ফরসা নয়, হয়তো কোনোকালে ফরসা ছিল; এখন ময়লা, তামাটে হয়ে গেছে। চোখ কিন্তু তার খুব সুন্দর। কী উজ্জ্বল নীল আর তীক্ষ! পোশাক তো আরো চমৎকার। লম্বা আলখেল্লা ঝুলছে কাঁধ থেকে পা পর্যন্ত; তার রং আবার দু-রকমেরঅর্ধেক লাল, অর্ধেক হলুদ। যে-কোনো লোক দেখলেই বুঝতে পারবে যে, এই লোকটি বাউণ্ডুলে, কোনো চালচুলো নেই, আপনজনও নেই কেউ, সমস্ত পৃথিবীতে কী স্বাধীন, মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে। অদ্ভুত লোকটির ঠোটে সর্বদা এক মিষ্টি হাসি খেলা করছে যেন। কেমন সুখী, তৃপ্ত, উদাসীন।।
সে এগিয়ে এল আরো। সকলের সম্মুখে, খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তারপর বলতে লাগল : হুজুর, আপনারা গণ্যমান্য লোক। আমার একটা আর্জি আছে। বাঁশি বাজিয়ে তাদের আমি বশ করতে পারি। বিশেষ করে যেসব প্রাণী লোকের ক্ষতি করে, যেমন ধরুনছুঁচো, কুনো ব্যাঙ, কি বিষাক্ত কোনো সরীসৃপ। সবই আমি বশীভূত করতে পারি। এজন্য সকলে আমাকে বহুরূপী বাঁশিওয়ালা বলে ডাকে। এতক্ষণ কেউ ঠাহর করে দ্যাখেনি, কিন্তু এ-মুহর্তেই নজরে পড়ল সকলেরতার গলা থেকে ঝুলছে লাল আর হলুদ রঙের একটা উড়ুনি, তারই প্রান্তদেশে বাধা রয়েছে একটা ভেঁপু। মনে হচ্ছে লোকটির হাতের দশ আঙুল যেন চঞ্চল হয়ে উঠল, এখনি হাত দিলেই বেজে উঠবে অলৌকিক মায়াবি ভেঁপু। কেউ কোনো কথা বলার আগেই বাঁশিওয়ালা আবার বলে উঠল : এই তো সেদিনগত জুন মাসে আমি তাতারদের দেশে গিয়েছিলাম, উঁশ-মাছির অত্যাচারে তারা অতিষ্ঠ্য ছিল। তারপরে এই সেদিন এশিয়া মহাদেশের এক অঞ্চলে রক্তচোষা বাদুড়ের উৎপাত দেখা দিয়েছিল। বাঁশি বাজিয়ে এগুলো দূর করলাম। ইঁদুর নিয়ে আপনাদের তো জ্বালা-যন্ত্রণার শেষ নেই, আমি ইঁদুর গুলো তাড়াব, অবশ্য আপনারা যদি চান। তার জন্য খুব বেশি এমন কিছু খরচ হবে
আপনাদের। বেশি না, কেবল এক হাজার গিল্ডার আমাকে যদি দয়া করে আপনারা—” কথা তার শেষও হল না, সভাস্থ সকলে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল : কী বলছ? এক হাজার? আমরা তোমাকে পঞ্চাশ হাজার গিল্ডার দেব। ক্ষীণ হাসির রেখা দেখা দিল বহুরূপী বাঁশিওয়ালার দুই ঠোঁটে।
রাস্তায় নামল তখন মায়াবি বাঁশিওয়ালা। ফু দিল তার বাঁশিতে। তীক্ষ্ণ চোখ তীক্ষ্ণতর হল, স্বপ্নের আভা খেলা করল সেখানে। বাঁশিতে ফু দিচ্ছে সে। কী সুরেলা সে-বাঁশির সুর। এত মধুর বাঁশি কেউ কখনো শোনেনি। আর তার পরেই আশ্চর্য সব কাণ্ড ঘটতে লাগল। হুটপাট-দুদ্দাড় আওয়াজ হচ্ছে। আবার বিস্ময়ে চোখ বিস্ফারিত করে সকলে দেখতে লাগল ইঁদুরের দল। তারা আসছে, ইদুরের দল, নাচতে নাচতে শহরের সব ঘরবাড়ি থেকে, আনাচ থেকে, কানাচ থেকে সব পথে বেরিয়ে এসেছে। ইঁদুর, ইঁদুর, ইঁদুর ইদুরে চারিদিক ছেয়ে গেল। রাজ্যের যত ইঁদুর এসে জড়ো হচ্ছে রাস্তায়। মোটা, রোগা, লম্বা, বেঁটে, কালো, ধলো, খয়েরি, পাটকিলে, লেজলম্বা, লেজ-ছোট, মোটা-মাথা, পেট-রোগা - হাজার রকমের হাজার বর্ণের লক্ষ লক্ষ ইঁদুর নাচতে নাচতে এগিয়ে আসছে আর জড়ো হচ্ছে রাস্তায়। তালে তালে বাজছে জাদুকরের ভেঁপু। রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে সে, সঙ্গে চলেছে। ঐ ইঁদুরের মিছিল : বাপ-মা, ভাই-বোন, চাচা-চাচি, নানা-নানি, দাদা-দাদি, ছেলে-বুড়ো প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে গায়ে গা মিলিয়ে গভীর আত্মীয়তায় তালে-তালে হেলেদুলে নেচেনেচে চলেছে রাস্তায়। একটি ইদুরও আর পড়ে নেই কোথাও, সবচেয়ে বাচ্চা ইঁদুরটিও বাদ যায়নি; বুড়ো অথর্ব যে, তার আনন্দও আজ বাধ মানছে না সকলের সাথে সেও চলেছে নেচেনেচে। একটা রাস্তা ছেড়ে আরেকটা রাস্তায় পা বাড়াচ্ছে, বড় রাজপথ ছেড়ে সরু গলিতে, আবার সেটা বাদ দিয়ে অন্যটায়। একপাশে পড়ে রইল বাজার, অন্যদিকে সরাইখানা, ওদিকটায় দোকানপশারি ইত্যাদি সব পার হয়ে সে যাচ্ছে নেচে-নেচে, তালে-তালে বাশি বাজছে তার, আর সেই তালে হেলেদুলে চলেছে হামেলিন শহরের সমস্ত ইদুরের দল।                                                                                  পরের পর্ব 

No comments:

Post a Comment

Popular Posts