Saturday, April 18, 2020

দ্যা মিলিওন পাউন্ড ব্যাংক নোট – মার্ক টোয়েন – The Million Pound Bank Note – Mark Twain - Bangla - (Part 1 of 3)

দ্যা মিলিওন পাউন্ড ব্যাংক নোট  মার্ক টোয়েন  TheMillion Pound Bank Note – Mark Twain - Bangla

দ্যা মিলিওন পাউন্ড ব্যাংক নোট মার্ক টোয়েন The Million Pound Bank Note – Mark Twain - Bangla (Part 1 of 3)
আমার বয়স তখন সাতাশ বছর সানফ্রান্সিসকোর এক খনির দালালের কেরানির কাজ করতাম আমি। শেয়ার লেন-দেনের কাজে আমার যথেষ্ট দক্ষতা ছিল নিজের বুদ্ধিবৃত্তি ও সুখ্যাতি ছাড়া জগতে নির্ভর করবার মতো আর কোনো সম্বল ছিল না আমার ভাগ্যের নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌছতে এই পরিস্থিতিই আমার সহায়ক হয়েছিল এবং তার পরিণতি আমি হাসিমুখেই বরণ করে নিয়েছিলাম। 
শনিবার দিন দুপুরে খাওয়ার পর আমার আর কোনো কাজ থাকত না। এই সময়টায় ছোট্ট একটা নৌকোয় পাল তুলে দিয়ে আমি সাগরে পাড়ি জমাতাম। একদিন সাহস করে একটু দূরেই গেলাম এবং গভীর সাগরের এলাকায় গিয়ে পড়লাম! রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে আমি যখন উদ্ধার পাবার সমস্ত আশা-ভরসা ত্যাগ করেছি তখন লন্ডনগামী একটি জাহাজ আমাকে তুলে নিল সে এক দীর্ঘ এবং ঝড়বিক্ষুব্ধ সমুদ্রযাত্রা। তারা আমাকে একটা সাধারণ নাবিকের কাজ দিয়েছিল, কিন্তু তার জন্য কোনো বেতন দিত না।
আমি যখন লন্ডনে পৌছুলাম তখন আমার পোশাক ছিন্ন ও নোংরা পকেটে সম্বল ছিল একটি মাত্র ডলার সেটা দিয়ে আমার একদিনের আহার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা হল পরের দিন আহার-বাসস্থান ছাড়াই কেটে গেল। তার পরদিন সকাল দশটার সময় ক্ষুধার্ত ও ধূলিমলিন অবস্থায় খুব কষ্টে পোর্টল্যান্ড প্রেস দিয়ে যাচ্ছিলাম হঠাৎ তখন দেখি, একটা ছেলে আমার পাশাপাশি যাচ্ছে। সে চমৎকার একটা নাশপাতি এক কামড় খেয়েই রাস্তার পাশের ঢালু জায়গায় ছুঁড়ে ফেলে দিল। আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম এবং কাদায় নিক্ষিপ্ত লোভনীয় ওই বস্তুটার ওপর আমার লুব্ধ দৃষ্টি নিবদ্ধ করলাম। আমার জিভে জল এসে গেল, ঠোট দুটো লোলুপ হয়ে উঠল এবং আমার সমস্ত সত্তা দিয়ে সেটাকে কামনা করতে লাগলাম কিন্তু আমার ভাগ্যটাই যেন কেমন! যখনই ওটাকে তুলবার জন্য অগ্রসর হতে যাই অমনি কোনো পথচারীর চোখে আমার উদ্দেশ্য ধরা পড়ে যায় আমি অবশ্য তখনই নিজেকে সংবরণ করে নিই এবং অন্যমনস্ক হয়ে এমন একটা ভাব দেখাই যে, আমি নাশপাতিটার কথা আদৌ চিন্তা করছি না। এই একই কান্ড বারবার ঘটতে লাগল কিন্তু আমি কিছুতেই নাশপাতিটাকে তুলতে পারলাম না।
অবশেষে আমি মরিয়া হয়ে, লজ্জা-শরম ত্যাগ করে যখন নাশপাতিটাকে নিতে যাব এমন সময় আমার পেছনে একটা জানালা থেকে এক ভদ্রলোক বলে উঠলেন : ভেতরে এস। একজন জমকালো ভূত্য আমাকে ভেতরে আহ্বান করে একটি সুসজ্জিত কক্ষে নিয়ে গেল সেখানে দু-জন বুড়ো ভদ্রলোক বসে ছিলেন। তারা পরিচারককে চলে যেতে বলে আমাকে বসতে বললেন। তারা সবেমাত্র তাদের প্রাতরাশ শেষ করেছেন। আহার্যের অবশিষ্টাংশ যা টেবিলে ছিল, তা আমাকে প্রলুব্ধ করল এই আহার্য দ্রব্য সামনে নিয়ে মাথা ঠিক রেখে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা তখন আমার পক্ষে কষ্টকর কিন্তু আমাকে আহারে আহ্বান জানালেন না তারা। সুতরাং অতিকষ্টে আমাকে লোভ সংবরণ করতে হল 
এর আগে সেখানে কিছু ঘটে গিয়েছিল, যা জানতে পেরেছিলাম বহু দিন পরে। ব্যাপারটা আমি এখনই বলছি। ওই বুড়ো দুজন পরস্পর ভাই গত কয়েক দিন যাবত দুজনে কোনো-একটা বিষয় নিয়ে খুব ঝগড়া করে কাটাচ্ছিলেন এবং ইংরেজদের চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী ওই দিনই একটি বাজি রেখে তারা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। 
হয়তো অনেকেরই মনে আছে, ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড একবার বিদেশের সঙ্গে বিশেষ কোনো আদান-প্রদান সুবিধার্থে দুটি দশলক্ষ পাউন্ডের নোট ছেপেছিল যে কোনো ভাবেই হোক, তার একটি ব্যবহৃত হয়ে বাতিল হয়ে গিয়েছিল আর অন্যটি তখনও ব্যাঙ্কের হেফাজতে ছিল ঐ নোটটাই সব গোলমালের উৎস। কথাপ্রসঙ্গে এক ভাই বলেছিলেন : যদি এমন হয় যে, একজন সৎ এবং বুদ্ধিমান আগন্তুক লন্ডনে এসে আটকে গেল। তার কোনো বন্ধুবান্ধবও শহরে নেই, সঙ্গে টাকাও নেইআছে শুধু দশলক্ষ পাউন্ডের একখানা নোট আর নোট প্রাপ্তির কোনো উপযুক্ত কারণ দর্শাবার উপায়ও তার নেই। এ অবস্থায় ওই আগন্তুকের জীবিকা-নির্বাহের কী উপায় হবে? 
প্রথম ভাই বলেছিলেন, সে অনাহারে মারা পড়বে দ্বিতীয় ভাই বলেছিলেন, না তা হবে না প্রথম ভাই বলেছিলেন, সে ওই নোটটি কোনো ব্যাঙ্কে ভাঙাবার জন্য উপস্থিত করতে পারবে না। কারণ, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে গ্রেফতার করা হবে তাদের তর্কের এই উত্তপ্ত পর্যায়ে দ্বিতীয় ভাই কুড়িহাজার পাউন্ড বাজি রাখলেন এই বলে যে, লোকটি ওই দশলক্ষ পাউন্ডের ওপর নির্ভর করে যে কোনো উপায়েই হোক ৩০ দিন কাটাতে পারবে। এবং জেলে যাওয়া থেকেও এড়িয়ে থাকতে পারবে প্রথম ভাই সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিলেন। খাটি ইংরেজ যেমন সাহসের পরিচয় দেয়, ঠিক তেমনি তিনি এ-কাজটি সম্পন্ন করলেন। এরপর তিনি তার কেরানিকে একখানি চিঠির মুসাবিদা দিলেন। এবং কেরানিটি পরিষ্কারভাবে চিঠিটা লিখে ফেলল দুই ভাই সারাদিন জানালার ধারে বসে রইলেন একজন উপযুক্ত লোকের সন্ধানে। 
অনেককেই তাদের সৎ বলে মনে হল কিন্তু খুব বুদ্ধিমান মনে হল না : তেমনি অনেককে বুদ্ধিমান মনে হল, কিন্তু সৎ মনে হল না। কেউ হয়তো দুই-, কিন্তু গরিব নয়; গরিব হলেও হয়তো আগম্ভক নয়। একটা-না-একটা ত্রুটি থেকেই যাচ্ছিল প্রায় প্রত্যেকেরই আমি সেখানে উপস্থিত হওয়ার পূর্বপর্যন্ত আমাকে দেখে তারা নিশ্চিত হলেন যে, আমি সমস্ত শর্ত পূর্ণ করেছি। সুতরাং, আমাকে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করালেন। 
এতক্ষণ ধরে আমাকে ডেকে আনবার কারণ জানবার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম আমি। তারা আমাকে আমার সম্বন্ধে প্রশ্ন করতে লাগলেন এবং খুব শিগগিরই আমার সমস্ত ঘটনা জেনে নিলেন অবশেষে তারা বললেন, আমাকে দিয়েই তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে। 
আমি বললাম, আমি খুব খুশি হয়েছি। জানতে চাইলাম, আমাকে কী করতে হবে তখন তাদের একজন আমার হাতে একখানা খাম দিলেন এবং বললেন, আমি তার ভেতর থেকেই প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারব। আমি খামটি খুলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু তারা আমাকে নিষেধ করে বললেন, নিজের ঘরে গিয়েই যেন সেটা খুলি এবং তা যেন মনোযোগ দিয়ে পড়ি। তাঁরা আমাকে তাড়াহুড়ো করতে নিষেধ করে দিলেন। আমি অবাক হয়ে গেলাম। এ-ব্যাপারে তাদের সঙ্গে আরও কিছু আলাপ-আলোচনা করতে চাইলাম। কিন্তু তারা তাতে রাজি হলেন না; আমাকে কেন্দ্র করে এমনি তামাশা করায় আমি কিছুটা অপমান বোধ করলাম এবং একটু মনোক্ষুন্ন অবস্থায় তাঁদের অনুমতি নিয়ে চলে এলাম কিন্তু আমি তাদের দেয়া দায়িত্ব গ্রহণ করলামযেহেতু ধনী ও প্রভাবশালী লোকের সঙ্গে ঝগড়া করার মতো অবস্থা আমার তখন নয়। 
আমি হয়তো সমস্ত জগতের সামনে দাড়িয়ে তখন সেই নাশপাতিটা তুলে খেয়ে ফেলতে পারতাম, কিন্তু দুঃখের বিষয় সেটা তার যথাস্থানে নেই। এই লোকগুলোর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যে ওটাকে হারালাম, তার জন্য তাদের প্রতি আমার অন্তর ঠিক সদয় হল না। সেই বাড়ি আমার দৃষ্টির বাইরে চলে গেলে আমি খামটি খুললাম এবং দেখলাম, তার ভেতরে টাকা আছে। তাদের প্রতি আমার ধারণা কিছুটা পরিবর্তিত হল আমি এক মুহুর্তও আর দেরি না করে টাকা এবং নোট আমার জামার পকেটে রাখলাম এবং নিকটস্থ সস্তা হোটেলের দিকে ধাবিত হলাম। সেখানে গিয়ে খেলাম খুব করে খাওয়া শেষ হবার পর আমি নোটটি বের করলাম। ভঁজ খুলে নোটটার দিকে এক নজর তাকানো মাত্রই বিস্ময়ে আমার জ্ঞান হারাবার উপক্রম। দশ লক্ষ ডলার!
আমার সমস্ত মাথাই বো বো করে ঘুরতে লাগল। আমি হয়তো বজ্রাহতের মতো নোটের দিকে তাকিয়ে বসেই থাকতাম, কিন্তু এক মিনিট না-যেতেই নিজকে সুস্থির সম্বিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হল।



প্রথমেই চোখে পড়ল, হোটেলের মালিককে। দেখলাম সে-ও এই নোটের দিকে তাকিয়ে আছে এবং সে ভয়ে প্রায় কাঠ হয়ে গেছে মনে মনে সে ঈশ্বরের নাম জপছিল কিন্তু দেখে মনে হচ্ছিল, সে হাত-পা নাড়া-চাড়া করতে পারছে না। আমি সোজা তার কাছে গেলাম। আমার পক্ষে ওই অবস্থায় যা করা উচিত ছিল তাই করলাম নোটটি তার কাছে বাড়িয়ে দিয়ে অন্যমনস্কভাবে বললাম : ভাঙতি দিন। 
আমার কথায় সে যেন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল এবং নোটটি ভাঙিয়ে দিতে না পারার জন্য হাজার বার আমার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করল কিন্তু কিছুতেই তাকে দিয়ে নোটটি স্পর্শ করানো গেল না। সে কেবল তাকিয়ে রইল নোটটার দিকে দেখে মনে হল, কিছুতেই যেন তার চোখের তৃষ্ণা মিটছে না সে এমন একটা ভাব দেখা যে, তার মতো গরিব লোকের পক্ষে এত পবিত্র জিনিস স্পর্শ করা উচিত নয়
আমি বললাম : আমি দুঃখিত যে, আপনার অসুবিধা হচ্ছে কিন্তু নোটটা ভাঙাতে আপনার হবেই। দয়া করে ভাঙতি দিন। কেননা, আমার কাছে আর কিছুই নেই। 
সে বলল, তাতে কিছু যায় আসে না। দেনা-পাওনাটা পরে মেটালেও চলবে।
আমি বললাম, কিছুদিনের জন্যে আমি আশেপাশে না-ও থাকতে পারি। সে উত্তরে বলল, সেজন্যে ভাবনা করার কিছু নেই, সে অপেক্ষা করে থাকতে রাজি আছে। পরন্তু, এমন ভাব দেখাল যে, আমি তার কাছ থেকে যে কোনো জিনিস যে কোনো সময় নিতে পারি এবং যত দিন খুশি তার দাম বাকি রাখতে পারি। সে বলল, আমার মতো একজন ধনী ভদ্রলোককে বিশ্বাস করতে তার কোনো ভয় নেই। বিশেষ করে আমার মতন একজন খেয়ালি লোককে, যে সাধারণ পোশাক পরে নিজের পরিচয় ঢেকে রেখে সাধারণ লোকের সঙ্গে ভাব করতে কৌতুক বোধ করে এরইমধ্যে অন্য একজন খরিদ্দার সেখানে প্রবেশ করলে দোকানের মালিক ইঙ্গিতে আমাকে ওই লোকটির দৃষ্টি থেকে দূরে থাকতে অনুরোধ করল। তারপর বেরিয়ে আসবার সময় সে দরজা পর্যন্ত আমার সঙ্গে এসে বার বার অভিবাদন করতে লাগল আমি সেখান থেকে বেরিয়ে সোজা রওনা হলাম সেই ভাইদের বাড়িতে। উদ্দেশ্য পুলিশ আমার পিছু নেবার আগেই আমি নিজে যেন তাদের ভুলটি সংশোধন করে দিতে পারি। আমি বেশ ঘাবড়ে গিয়েছিলামবস্তুত, ভীতই হয়ে পড়েছিলামযদিও আমার নিজের কোনো দোষ ছিল না।
কিন্তু আমি জানি, লোকে যখন এক পাউন্ড মনে করে দশলক্ষ পাউন্ডের একটা নোট রাস্তার একটা নিঃস্বের হাত দিয়ে দেয়, তখন নিজের বোকামির কথা না-ভেবে ওই লোকটির ওপর ভয়ানক রেগে যায়। আমি সেই বাড়িতে উপস্থিত হওয়ার পর আমার উত্তেজনা অনেকটা প্রশমিত হল দেখলাম সবাই সেখানে বেশ চুপচাপ অর্থাৎ ভুলটা তখনও ধরা পড়ে নি ঘণ্টা বাজালাম সেই ভৃত্যটি এল আমি তাকে বললাম, ওই ভদ্রলোক দুজনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। 
তারা চলে গেছেন, তার জাতীয় বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী গম্ভীর ও নির্বিকার চিত্তে ভূত্যটি জবাব দিল 
চলে গেছেন! কোথায়?
ভ্রমণে।  
ঠিকানা?
বোধহয় অন্য কোনো মহাদেশে।
অন্য মহাদেশে!
হঁ স্যার।'
কোন পথে, কিসে গেছেন?  
আমি জানি না।
কখন তারা ফিরবেন?  
বলে গেছেন, একমাসের মধ্যে।  
একমাস! ভয়ানক ব্যাপার! তাদের সঙ্গে কীভাবে কথার আদান-প্রদান করা যায়, সে সম্বন্ধে আমাকে বুদ্ধি বাতলে দাও তো অত্যন্ত জরুরি ব্যাপার।  
আমি অক্ষম স্যার। আমার ধারণাই নেই যে, তারা কোথায় গেছেন।  
তা হলে তাদের পরিবারের কোনো লোকের সঙ্গে দেখা করতে হয়।  
পরিবারের সবাই বাইরে কয়েক মাস আগেই তারা গেছেন। তারা মিসর এবং ভারতে আছেন বলে মনে হয়।  
তাদের বিরাট একটা ভুল হয়ে গেছে। আমার ধারণা রাত হবার আগেই তারা নিজেদের ভুল টের পেয়ে ফিরে আসবেন। তাদের বলবে যে, আমি এসেছিলাম এবং ব্যাপারটা মিটমাট না-হওয়া পর্যন্ত আমি আসতে থাকব তাদের ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
তারা এলে আমি বলব, কিন্তু তাঁদের ফিরবার কোনো সম্ভাবনাই আমি দেখছি না তারা বলে গেছেন, আপনি একঘণ্টার মধ্যেই তাদের খোঁজ করতে আসতে পারেন। তারা আমাকে হুকুম দিয়ে গেছেন। আমি যেন আপনাকে বলে দেই যে, সব কিছু ঠিক আছে যথাসময় তারা এখানে উপস্থিত হবেন এবং তখন তারা আপনার উপস্থিতি আশা করেন। 
অতএব আমাকে হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হল। কী বিশ্রী সমস্যা আমার মনটা ভেঙে পড়বার উপক্রম হল। তারা এখানে আসবেন যথাসময়ে- তার অর্থ কী? ও হ্যা, খামের ভেতরকার চিঠিটায় হয়তো এর একটা হদিস থাকতে পারে। এতক্ষণ চিঠির কথা ভুলে ছিলাম চিঠিটা বের করে পড়তে আরম্ভ করলাম
তাতে লেখা ছিল : ‘আপনি একজন বুদ্ধিমান ও সৎলোক--- সেটা যে-কেউ আপনাকে দেখলে বলে দেবে! আমরা মনে করি, আপনি দরিদ্র এবং এখানে আগন্তুক চিঠির সঙ্গে টাকা দেয়া হল। তিরিশ দিনের জন্যে সে টাকা আপনাকে বিনা সুদে ধার দেওয়া হল। এই সময় উত্তীর্ণ হলে আপনি এ বাড়িতে আসবেন! আপনার ওপর আমি বাজি রেখেছি। যদি আমি সেটা জিতে যাই, তাহলে আপনার পছন্দসই ও যোগ্যতা মাফিক আমার দানপত্রের আওতাভুক্ত ভালো একটা চাকরির ব্যবস্থা আপনাকে করে দেব।  
চিঠিতে কোনো সই, ঠিকানা বা তারিখ ছিল না। একটা বিরাট ঘোরালো ব্যাপার এটা আমার পক্ষে একটা গভীর ও জটিল ধাধা তাদের মতলবটা কী, তার এতটুকুও বুঝতে পারলাম না। এর দ্বারা আমার ক্ষতি সাধন করা হচ্ছে, না আমাকে দয়া করা হচ্ছে তা-ও বুঝতে পারলাম না। একটা পার্কে বসলাম এবং চিন্তা করে বার করতে চেষ্টা করলাম, আমার কী করা উচিত। একঘণ্টা ধরে নিজে যুক্তিতর্কের অবতারণা করে একটা সিদ্ধান্তে এসে পৌছুলাম। সিদ্ধান্তটা এরকম : 
এই লোক দুটি আমাকে ভালো মনে করেছে, না খারাপ মনে করেছেতা ঠিক করবার কোনো উপায় নেই। সেটা তাদের একটা খেয়াল, না মতলব, না একটা পরীক্ষাতা, বুঝবার কোনো উপায় নেইথাকগে সেটাও আমার ওপর বাজি রাখা হয়েছে কিসের বাজিতা-ও জানবার উপায় নেই। এ রকম অসংখ্য সমাধানবিহীন বিষয় ভেবে অবশিষ্ট যেটা রইল সেটা চলমান ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তু এবং তাকে বাস্তব সত্যের পর্যায়ে ফেলা চলে। যদি আমি ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডকে নোটটা ওই লোকের নামে জমা করে নিতে বলি, তারা সেটা করবে, যেহেতু ব্যাঙ্ক তাকে জানেযদিও আমি তার কিছুই জানি না কিন্তু তারা আমাকে জিজ্ঞেস করবে, আমি কী করে ওটা পেলাম যদি সত্যি কথা বলি তবে আমাকে সঙ্গতভাবেই পাগলাগারদে পাঠাবে; আর যদি মিথ্যে কথা বলি, তা হলে পাঠাবে জেলে। যদি আমি এটা ভাঙাতে চেষ্টা করি অথবা এর বদলে টাকা ধার নিই, তা হলেও একই ফল হবে আমার পছন্দসই হোক বা অপছন্দই হোক, এই ভদ্রলোক দুজন না-আসা পর্যন্ত এ-বিরাট বোঝা আমাকে যে বয়ে বেড়াতে হবে! একমুঠো ছাইয়ের মতো এটা আমার কাছে মূল্যহীন তবুও জীবিকা অম্বেষণের খাতিরেই এ নোটখানার প্রতি লক্ষ রাখতে হবে ইচ্ছে করলেও আমি এটা কাউকে দিয়ে দিতে পারব না। একজন লোক তা সে সৎ কিংবা ডাকাত যাই হোক, কোনো প্রয়োজনেই এটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে পারে না ওরা দু-ভাই নিরাপদেই আছেন। যদি আমি তাঁদের এই নোটটা হারিয়ে অথবা পুড়িয়ে ফেলি, তা হলেও তারা নিরাপদ। কেননা তারা এই নোটটার ভাঙতি বন্ধ করে দিতে পারেন এবং পরে ব্যাঙ্ক থেকে তাদের সমস্ত টাকাই তুলে নিতে পারেন। কিন্তু আমাকে বিনা মজুরিতে এই একমাস যাবত দুর্ভোগ পোহাতেই হবে, যদি-না সেই বাজিটাসে যাই হোক-না কেন--জিতে প্রতিশ্রুত চাকরিটা না-পাই। আর সেটা আমার পেতে হবে তাদের পর্যায়ের লোকেরা দানস্বরূপ যে চাকরি আমাকে দেবেন সেটা গ্রহণোপযোগী হবে নিশ্চয়ই। 
চাকরির ব্যাপার সম্বন্ধে আমি বেশ কিছু ভাবতে আরম্ভ করলাম আমার আশা বেড়ে যেতে লাগল। বেতন নিশ্চয়ই খুব বেশি হবে। একমাস পরেই চাকরিটা হবে এবং তার পরেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি নিজেকে প্রথম শ্রেণীর লোক বলে অনুভব করতে লাগলাম। আমি আবার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে শুরু করলাম। একটা দর্জির দোকান দেখে আমার মনে ময়লা কাপড়-চোপড় ছেড়ে সুন্দর বেশভূষা পরবার বাসনা জেগে উঠল আমার সে-সংস্থান আছে কি? না, পৃথিবীতে আমার দশলক্ষ পাউন্ড ছাড়া আর কিছুই নেই। সুতরাং, নিজেকে জোর করেই সেখান থেকে টেনে নিয়ে গেলাম কিন্তু পরে আবার পিছুটান বোধ করতে লাগলাম লোভ আমাকে পীড়া দিতে লাগল যতক্ষণ আমার ভেতরে এই দ্বন্দ্ব চলছিল ততক্ষণ আমি দোকান ছাড়িয়ে আরও ছয়গুণ পথ অতিক্রম করতে পারতাম। অবশেষে লোভের কাছে পরাভব স্বীকার করতে হল--তাছাড়া উপায় ছিল না। দর্জির দোকানের ভেতর গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তাদের কাছে গায়ে লাগেনি বলে ফেরত দেয়া কোনো স্যুট আছে কি না। যে লোকটির সঙ্গে কথা বললাম, সে উত্তর না দিয়ে শুধু মাথা নেড়ে অন্য একটা লোককে দেখিয়ে দিল। তার কাছে গেলাম; সে-ও মাথার ইঙ্গিতে অন্য লোককে দেখিয়ে দিল, কিন্তু কথা বলল না। আমি তার কাছে যেতেই সে বলল : একটু অপেক্ষা করুন, আপনার কথা শুনছি। 
তার কাজ শেষ না-হওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করলাম। তারপর সে আমাকে পেছনের কামরায় নিয়ে গেল এবং বাতিল স্যুটের এক গাদার মধ্যে সন্ধান করে সবচেয়ে বিশ্রী একটা স্যুট আমার জন্যে বের করল। আমি সেটা পরলাম কিন্তু আমার গায়ে লাগল না এবং কোনোমতেই সেটা আমার মনমতো হল না কিন্তু নতুন বলে সেটা নেবার লোভ সামলাতেও পারছিলাম না। কোনো ত্রুটির কথা উল্লেখ না করে দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে বললাম : এর দামের জন্যে যদি কিছুদিন আপনি অপেক্ষা করতে পারেন, তবে আমার বড় সুবিধে হয়। আমার কাছে খুচরো টাকা নেই। 
আমার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গেই লোকটির চোখে-মুখে একটা অবজ্ঞার ভাব ফুটে উঠল। সে বলল : , আপনার কাছে নেই! আমি সেটা আশাও করিনি। আপনার মতো লোকের কাছে বেশি টাকা না থাকাই স্বাভাবিক। 
আমি খুব আঘাত পেলাম এবং ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললাম ; বন্ধু, কোনো লোককে শুধু পোশাক দিয়ে বিচার কর না। আমি সহজেই এই স্যুটের দাম দিতে পারি বড় একটা নোট ভাঙানোর জন্যে তোমাকে আমি কষ্ট দিতে চাইনি।
এ কথায় সে তার ধরনটা একটু পরিবর্তন করল তবুও সেই ভাব বজায় রেখে বলল : আপনাকে কোনোরকম খারাপ ইঙ্গিত করে আমি কথাটি বলিনি। তবু বলতে চাই আপনার নোটের ভাঙতি দিতে পারি কি না, সেটা আপনার দেখবার বিষয় নয়। আশা করি আমরা ভাঙতি দিতে পারব। 
আমি নোটটি তার হাতে দিয়ে বললাম : বেশ আমি মাফ চাইছি।
                                              পরের পর্ব 

No comments:

Post a Comment

Popular Posts