মজার গল্প, উপন্যাস, গোয়েন্দা কাহিনী, ছোট গল্প, শিক্ষামূলক ঘটনা, মজার মজার কৌতুক, অনুবাদ গল্প, বই রিভিউ, বই ডাউনলোড, দুঃসাহসিক অভিযান, অতিপ্রাকৃত ঘটনা, রুপকথা, মিনি গল্প, রহস্য গল্প, লোমহর্ষক গল্প, লোককাহিনী, উপকথা, স্মৃতিকথা, রম্য গল্প, জীবনের গল্প, শিকারের গল্প, ঐতিহাসিক গল্প, অনুপ্রেরণামূলক গল্প, কাহিনী সংক্ষেপ।

Total Pageviews

Friday, May 28, 2021

ছোট গল্প - স্কুলস অ্যান্ড স্কুলস – ও হেনরী – বাংলা অনুবাদ –Schools and schools by O. Henry – Translation in Bengali - Short story

ও হেনরী,বাংলা অনুবাদ,Schools and schools by O. Henry,Short story,Translation in Bengali,valobasar golpo,premer golpo,ছোট গল্প

ছোট গল্প - স্কুলস অ্যান্ড স্কুলস ও হেনরী বাংলা অনুবাদ – Schools and schools by O. Henry – Short story - Translation in Bengali


১ 

বৃদ্ধ জেরোম ওয়ারেন (Jerome Warren) এর বাসস্থান ; ৩৫, ইষ্ট ফিফটি সোফোর্থ স্ট্রীট (Soforth Street)-এর একটি লক্ষ ডলার মূল্যের বাড়ি। শহরের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের একজন দালাল (broker) ও ঐশ্বর্যশালী মানুষ তিনি। তার শরীরের জন্য প্রতিদিন কয়েকটা ব্লক পায়ে হেঁটে তারপর অফিসে যেতেন ট্যাক্সি করে।  

পোষ্যপুত্র ছিল একজন পুরনো বন্ধু গিলবার্টের (Gilbert) ছেলে সিরিল স্কট (Cyril Scott Gilbert)। যখন সে সবে টিউব চেপে (squeeze) রঙ বার করতে শিখেছে তখন থেকে একজন সফল চিত্রকর (painter) হয়ে উঠেছে। সংসারের অপর এক সদস্য বারবারা রস (Barbara Ross), দত্তক ভ্রাতুস্পুত্রী (a stepniece)। দুঃখ কষ্ট সহ্য করতেই বোধহয় জন্মগ্রহণ করা তার। তাই জেরোম অন্যের বোঝা ঘাড়ে তুলে নিয়েছিলেন।    

গিলবার্ট (জুনিয়র) ও বারবারা সুখেই বড় হতে লাগল। তারা হয়ত মনে মনে জানত এভাবেই কেটে যাবে কিন্তু তা হল না। দুর্যোগ দেখা দিল।।

ত্রিশ বছর আগে যখন জেরোম যুবক ছিলেন সেই সময় ডিক নামে এক ভাই ছিল তার। সৌভাগ্যের সন্ধানে সে পশ্চিমে চলে গিয়েছিল। অনেক দিন কোন খোঁজ খবর ছিল না তারপর একদিন বুড়ো জেরোম ভাইয়ের কাছ থেকে চিঠি পেলেন। যে কাগজে চিঠিটা লেখা হয়েছিল তাতে মাংস ও কফির গন্ধ, হাতের লেখাটা ছিল হাঁপানি রোগীর মত, বানানগুলো সেন্ট ভেটুসির (St. Vitusy) মত।

জানা গেল সৌভাগ্যের কাছ থেকে কিছু পাওয়া দুরের কথা ডিক নিজেই বন্দী হয়ে শত্রুর দেশে চলে গেছে জামিনদার হয়ে। অর্থাৎ সর্বনাশের শেষ সীমায় গিয়ে পৌঁছেছে (pegging out) ডিক। উনিশ বছর বয়সের কন্যা, আর তাকেই সে খরচ খরচা দিয়ে জাহাজে চাপিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছে জেরোমর কাছে মেয়ের খাওয়া পড়া, লেখাপড়া, আরাম-আয়েস থেকে শুরু করে বাকি জীবনের সব দায়িত্ব জেরোমের ঘাড়েই চাপিয়ে দিয়ে।

বুড়ো জেরোম ছিলেন এক সর্ববাহী বাহন। (গ্রীক মিথ অনুযায়ী) সকলেই জানে এটলাস ধারন করে আছে পৃথিবীকে, এটলাস দাঁড়িয়ে আছে রেলের বেড়ার উপর, সেই রেলের বেড়া বসান হয়েছে কচ্ছপের পিঠের ওপর। এখন কচ্ছপেরও তো দাঁড়াবার মত একটা কিছু চাই। সেটাই হচ্ছে একটা সর্ববাহী বাহন যা তৈরী হয় জেরোমের মত মানুষদের দিয়ে।

মানুষ কোন দিন অমরত্ব লাভ করবে কিনা জানি না। তা যদি না করে তাহলে জানতে ইচ্ছা করে বুড়ো জেরোমের মত মানুষেরা (এই দুনিয়ায়) কবে তাদের প্রাপ্য পাবে?

তারা স্টেশনে নেভাডা ওয়ারেনের (Nevada Warren) সঙ্গে দেখা করল। ছোট মেয়ে, একেবারে রোদে পোড়া, দেখতে মোটামুটি ভাল, চালচালনও সহজ সরল। দেখলেই মনে হবে সে বুঝি শিকারে যায়। কিন্তু তার সাদা কুর্তা আর কাল ঘাঘরা দেখে অন্য কথা ভাবতে হয়। তার ভারী মালটা তুলতে কুলি গলদঘর্ম হচ্ছে অথচ মেয়েটা সেটাকে ঘাড়ে তুলে নিল সহজেই।

তার রোদে পোড়া গালে চুমু খেয়ে বারবারা বললআমি নিশ্চিত আমাদের খুব ভাব হবে।

Nevada বলল--আমিও তাই আশা করছি

বুড়ো জেরোম বললেন—“আদরের ভাই-ঝি আমার তোমাকে স্বাগত। মনে কর এটা নিজেদের বাড়ি।

--ধন্যবাদ। নেভাডা বলল।

গিলবার্ট হেসে বলল-আমি তোমাকে বোনটি বলে ডাকব।

নেভাডা--দয়া করে এই ব্যাগটা (valise) ধর। এটার ওজন দশ লক্ষ পাউণ্ড। বাবার ছটা পুরনো খনি থেকে সংগ্রহ করা নমুনাগুলো এর মধ্যে আছে।

 

যখন একটি পুরুষ ও দুটি মহিলা অথবা একটি মহিলা ও দুটি পুরুষ এবং একজন সম্রান্ত লোক-এদের মধ্যে কোন স্বাভাবিক জটিলতা দেখা দেয়, তখন সে সমস্যাকে বলা হয় ত্রিভূজ। এই ত্রিভুজ সবসময় সমদ্বিবাহু (isosceles) হয়ে থাকে কখনোই সমবাহু (never equilateral) ত্রিভুজ হয় না। অতএব নেভাডা ওয়ারেন, গিলবার্ট ও বারবারা রস মিলে ত্রিভূজ গড়ে উঠল। বারবারা হল অতিভূজ।

একদিন সকলে বুড়ো জেরোম প্রাতরাশের পর কাগজ দেখছিলেন। নেভাডাকে তার খুব ভাল লেগেছে, মৃত ভাইটির শান্ত, স্বাধীন চিত্ত এ অকৃত্রিম সরল স্বভাবের পরিচয় তার মধ্যে রয়েছে।

এক পরিচারিকা মিস্ নেভাডাকে একটা চিরকুট এনে দিয়ে বলল--একটি পত্রবাহক ছেলে দরজায় দাঁড়িয়ে এটা দিল। উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছে।

নেভাডা শিস (whistling a Spanish waltz) দিতে দিতে রাস্তার গাড়ি দেখছিল। হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নিল। চিঠিটা খোলার আগে বাঁ দিকের উপর সোনালী চিহ্নটা দেখেই সে বুঝতে পারল গিলবার্ট পাঠিয়েছে।

চিঠিটা পড়ে গম্ভীর মুখে চাচার কাছে এসে দাঁড়াল। জেরোম চাচু, গিলবার্ট খুব ভাল ছেলে তাই না?  

জেরোম বললেন-তাই বুঝি সোনা মা। ভাল ছেলে হবে না, আমি নিজের হাতে মানুষ করেছি।

নেভাডা বলল-এই চিঠিটা পড়ে বল এটা কি উচিত হয়েছে? কি জানি, শহরের লোকজন ও তাদের চাল-চালন আমি ঠিক জানি না।

জেরোম কাগজটা রেখে চিঠিটা খুব মন দিয়ে দুতিনবার পড়লেন।

তারপর বললেন-মা গো, তোমার কথা শুনে আমি তো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, অবশ্য ও ছেলেকে আমি ভালই চিনি। একেবারে বাবার ছাঁচে গড়া। হীরের টুকরো ছেলে (gilt-edged diamond)। তুমি ও বারবারা আজ বিকেল চারটের সময় মোটরে চেপে লং আইল্যাণ্ডে খাবার জন্য তৈরী থাকতে পারবে কিনা তাই জিজ্ঞাসা করেছে। এর মধ্যে নিন্দার (criticise) কিছু দেখছিনা, তবে চিঠির কাগজটা ছাড়া নীল রঙের কাগজ আমি দেখতে পারি না।

নেভাডা প্রশ্ন করল--যাওয়াটা ঠিক হবে?

--হ্যা-হ্যা, বাবা নিশ্চয়, কেন ঠিক হবে না? তবু তুমি যে এত সাবধান হয়েছ তাতে খুশি হয়েছি। যাবে অবশ্যই যাবে।

—‘আমি বুঝতে পারি নি। তাই ভাবলাম তোমায় জিজ্ঞাসা করি। তুমিও আমাদের সঙ্গে চল না চাচ্চু।

---‘আমি! না না। আমি একবারই গাড়ি চেপেছি। তাও ছেলে চালিয়েছিল। আর যাইনি। কিন্তু তোমার ও বারবারার যেতে বাধা নেই। কিন্তু আমি যাব না।

একছুটে দরজার কাছে গিয়ে নেভাডা পরিচারিকাকে বলল-আমরা নিশ্চয় যাব, মিস বারবারার হয়ে আমি বলছি। ছেলেটাকে বলে দাও সে যেন মিঃ ওয়ারেনকে গিয়ে বলে আমরা নিশ্চয় যাব।

জেরোম হাঁক দিলেননেভাডা আমাকে মাপ কর। কিন্তু বলছিলাম কি, তাকে একটা চিঠি লিখে জবাবটা জানিয়ে দিলে ভাল হয় না। কেবল একটা লাইন লিখলেই চলবে।  

নেভাডা বলল- না, তার কোন দরকার হবে না। গিলবার্ট ঠিকই বুঝতে পারবে। আমি জীবনে কখনও মোটরে চড়িনি। কিন্তু ডিঙি নৌকো (canoe) চালিয়ে স্ট হর্স গিরিখাতের (Lost Horse Canon) ভিতর দিয়ে লিটল ডেভিল নদীতে (Little Devil River) গিয়েছি। মোটরে যাওয়াটা কেমন তা জানতে ইচ্ছা করছে।

 

ধরে নেওয়া যাক, মাস দুই কেটে গেছে।

বারবারা বসে আছে এক লক্ষ ডলারের বাড়ির পড়ার ঘরে। ঘরটা বেশ ভাল। পৃথিবীতে সময় কাটাবার মত অনেক জায়গা আছে তার মধ্যে পড়ার ঘর সেরা। (Many places are provided in the world where men and women may repair for the purpose of extricating themselves from divers difficulties. There are cloisters, wailing-places, watering- places, confessionals, hermitages, lawyer's offices, beauty parlors, air-ships, and studies; and the greatest of these are studies.)

সাধারণতঃ অতিভূজই একটা ত্রিভূজের সব থেকে বড় রেখা সেটা বুঝতে অনেক দিন সময় লাগে। কিন্তু সেই দীর্ঘ রেখাটার কেন বাঁক থাকে না।  

বারবারা একা ছিল, জেরোম ও নেভাডা গিয়েছিল থিয়েটারে। বারবারা ইচ্ছা করেই যায়নি, সে চেয়েছিল বাড়িতে পড়াশুনা করবে।

ওক কাঠের লাইব্রেরী টেবিলে বসে সে একটা সিল করা চিঠি নাড়াচাড়া (dextral fingers nervously manipulated) করছিল। চিঠিটা নেভাডাকে লেখা। খামের ওপরে সোনালী চিহ্ন (little gold palette)। নেভাডা চলে যাবার পর পিওন চিঠি দিয়ে গেছে।

চিঠিতে কি লেখা আছে সেটা জানবার জন্য বারবারা মুক্তোর নেকলেসটা দিয়ে দিতে রাজী কিন্তু যে কোন উপায়ে চিঠিটা খুলে পড়তেও পারে না, কারণ তার মর্যাদাই এ পথে বাঁধা। উজ্জ্বল আলোর সামনে খামটিকে ধরে চিঠির কয়েকটি লাইন পড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু যে ধরনের খাম ও কাগজ তাতে সে চেষ্টা ব্যর্থ হল।

জেরোম, নেভাডা দুজনে ফিরল, সাড়ে এগারটার সময়। ট্যাক্সি থেকে দরজা পর্যন্ত আসতে বরফের টুকরোয় ভিজে গেল সর্বাঙ্গ। জেরোম কিছুক্ষণ ট্যাক্সি পরিষেবার অব্যবস্থা ও রাস্তার যানজট নিয়ে বকবক করলেন। নেভাডা তার নীলকান্ত মনির (sapphire eyes) মত চোখে ঝিলিক টেনে বলতে লাগল, তার বাপের বাড়ির ঝড়ের রাতের গল্প আর বারবারা ঠাণ্ডা মাথায় কাঠ কাটতে লাগল তার থেকে ভাল কোন কাজ মাথায় এল না।

জেরোম সঙ্গে সঙ্গে উপরে গিয়ে, গরম জলের বোতল ও কুইনল খুঁজতে লাগলেন। নেভাডা পড়ার ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসে দেখে আসা নাটকটার দোষ ত্রুটি বলতে লাগল।

বারবারা বলল- তোমার চিঠি আছে ভাই। তোমরা বেরিয়ে যাবার পর একটা লোক দিয়ে গেছে।

-কার চিঠি?

বারবারা হেসে বলল--সত্যি জানো না, তবে আমি অনুমান করতে পারি, খামের কোনে চিহ্ন দেখে মনে হল গিলবার্টের।

বিশেষ আগ্রহ না দেখিয়ে নেভাডা বলল- আমাকে আবার সে কি লিখেছে তা তো জানি না।

বারবারা বলল--আমরা মেয়েরা সকলেই এক, ডাকঘরের ছাপ দেখেই চিঠিতে কি লেখা আছে অনুমানের চেষ্টা করি। শেষে কাচির সাহায্যে উল্টো দিক থেকে পড়বার চেষ্টা করি। এই নাও তোমার চিঠি।

চিঠিটাকে নেভাডার দিকে ঠেলে দিল।

---‘যত সব বাঘা বনবিড়াল’ (Great catamounts) নেভাডা চেঁচাল, এই বোতামগুলো খুব গোলমেলে (nuisance), আঃ বারবারা, দয়া করে খামটা ছিড়ে চিঠিটা পড়, দস্তানা খুলতে রাত বারটা বেজে যাবে।

সে কি সোনা? তুমি নিশ্চয়ই চাও না যে তোমাকে লেখা গিলবার্টের চিঠিটা পড়ে দেব। এটা তোমার চিঠি অন্য কেউ পড়বে কেন?

নেভাডা শান্ত চোখে একবার তাকাল।

বললকেউ আমাকে কখনও এমন কিছু লেখে যা অন্য কেউ পড়তে পারে না। তুমিই পড় বারবারা। গিলবার্ট হয়তো চাইছে কাল আবার তার গাড়ী করে বেড়াতে যাই।

অনিচ্ছা সত্বেও বারবারা খামটা খুলল।

[Curiosity can do more things than kill a cat; and if emotions, well recognized as feminine, are inimical to feline life, then jealousy would soon leave the whole world catless. Barbara opened the letter, with an indulgent, slightly bored air.]

বলল- ঠিক আছে তুমি যখন বলছ এখন পড়ছি।

খামটা ছিড়ে দ্রুতবেগে চিঠিটা পড়ে নিল, আবার পড়ল। তারপর বাঁকা চোখে নেভাডার দিকে তাকাল। নেভাডাকে দেখে মনে হচ্ছিল দস্তানাটাই তার আগ্রহের বস্তু। আর চিঠিটা মঙ্গল গ্রহ (Mars) থেকে পাঠানো বার্তা যেন।

বারবারা পনেরো সেকেণ্ড মত স্থির দৃষ্টিতে নেভাডার দিকে তাকাল। এত সুক্ষ্ম হাসি হাসল কেন বোঝা গেল না।

সৃষ্টির আদি কাল থেকে কোন নারী অন্য নারীর কাছে রহস্যময়ী হয়ে থাকতে পারেনি। আলোকরশ্মির মত তীব্র গতিতে একটি নারী অপর এক নারীর অন্তর ও মনের মধ্যে প্রবেশ করে তার ভঙ্গীমার প্রতিটি সুক্ষ্মতম বাণীর ইঙ্গিতকে ধরতে পারে, তার গোপনতম বাসনাকে বিশ্লেষণ করতে পারে।

বারবারা কিছুটা ইতস্তত করল। তারপর কিছুটা বিচলিতভাবে বলল--সত্যি নেভাডা আমাকে দিয়ে চিঠিটা খোলান তোমার উচিত হয়নি। আমি নিশ্চিত এ চিঠির কথাগুলো অন্য কেউ জানুক তা সে চায়নি।

মুহূর্তের জন্য নেভাডা তার দস্তানার কথা ভুলে গেল।

বলল- তাহলে সকলকেই পড়ে শোনাও। তুমি যখন পড়েই ফেলেছ, তখন আর তফাৎ কি হবে? ওয়ারেন যদি আমাকে এমন কিছু লিখে থাকে যা অন্যের জানা উচিত নয়, তাহলে তা শুধু সেই জন্যই সকলেরই সেটা জানা উচিত।

বারবাবা বলল- বেশ, চিঠিতে লেখা আছে-প্রিয়তম নেভাডা-রাত বারটার সময় স্টুডিয়োতে চলে এস। ভুল হয় না যেনো।

উঠে গিয়ে চিঠিটা নেভাডার কোলে ফেলে দিল বারবারা। বলল--সব কথা জেনে ফেলেছি বলে আমি দুঃখিত। গিলবার্টের মত লোকের এ কাজ করা উচিত হয়নি। একটা ভুল নিশ্চয় হয়েছে। তুমি কি ধরে নিতে পার না নেভাডা যে আমি এসব জানি না। চিঠির মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝছিনা। হয়তো গিলবার্টই বুঝিয়ে বলবে। আমি উপরে যাচ্ছি, বড় মাথা ধরেছে। শুভরাত্রি।

 

নেভাডা পা টিপে হলঘরে চলে গেল। তার কানে এল বারবারার ঘরের দরজা বন্ধের শব্দ। পড়ার ঘরের ঘড়িতে তখন বারটা বাজতে পনের। সে সদর দরজায় ছুটে গেল। বরফের ঝড়ের মধ্যেই ছয় স্কোয়ার দুরে ওয়ারেনের স্টুডিয়োর দিকে পা বাড়াল।

ইষ্ট রিভার থেকে আসা বরফে শহর ছেয়ে গেছে। রাস্তায় এক ফুট গভীর বরফ জমে গেছে। বড় বড় রাজপথগুলো পম্পেইর রাস্তার (street in Pompeii) মত স্তব্ধ। গাড়িগুলো বরফের ভিতর দিয়ে চলেছে। চন্দ্রালোকিত সমুদ্রের উপর শ্বেত পক্ষ ঈগলের (white-winged gulls) ঝাকের মত। মাঝে মাঝে দু একটা মোটর গাড়ি হিস হিস্ শব্দ করে এগিয়ে চলেছে।

ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সমুদ্রের বুকে ছোট একটা সামুদ্রিক পাখির মত ছুটতে লাগল নেভাডা। রাস্তার মোড়ে পুলিশ তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল-আরে মাবেল। এত রাতে আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

চলতে চলতে নেভাডা বলল-আমি, আমি একটু ওষুধের দোকানে যাচ্ছি।

এ অজুহাতে অত্যন্ত সন্দিগ্ধ মানুষেরও মন গলে। এতেই কি প্রমাণ হয় না যে নারী জাতি চিরদিনই এক এবং অদ্বিতীয়া অথবা বুদ্ধিতে এবং ছলনায় (intellect and wiles) পরিপক্ক হয়েই সে আদমের (আঃ) পাঁজরা থেকে বেরিয়ে আসে।

হঠাৎ এক সময় চোখের সামনে ভেসে উঠল স্টুডিয়োর বড় বাড়িটা। সেখানে বানিজ্য ও আর শত্রু প্রতিবেশী চারুকলার সহ অবস্থান। এলিভেটরটা দশ তলায় গিয়ে থামল।

নরকের সিঁড়ির আটটা ধাপ উঠে (flights of Stygian stairs) ৮৯ নম্বরের ঘরে ধাক্কা দিল। বারবারা ও জেরোম চাচ্চুর সঙ্গে অনেকবার সে এখানে এসেছে।

গিলবার্টই দরজা খুলল। হাতে পেন্সিল, চোখের ওপর সবুজের ছোপ, মুখে একটা পাইপ। পাইপটা মেঝেতে পড়ে গেল।

নেভাডা বলল-- আমার কি খুব দেরী হয়ে গেল? আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসেছি। চাচ্চু ও আমি থিয়েটারে গিয়েছিলাম। তুমি আসতে বলেছ, আমি এসেছি, চিঠিতে এইটুকু ছিল, ডেকেছিল কেন?

---আমার চিঠিটা তুমি পড়েছ?

---বারবারই আমাকে শুনিয়েছে। আমি পড়ে দেখেছি। তাতে লেখা ছিল রাত বারটার সময় আমার স্টুডিয়োতে অবশ্যই এস। আমি অবশ্য ভেবেছিলাম তোমার অসুখ করেছে। কিন্তু তোমাকে দেখে সে রকম মনে তো হচ্ছে না।  

গিলবার্ট বলে উঠল --- আহা! কেন যে তোমাকে আসতে লিখেছি সেটা এখনই বলছি। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। আজ রাতেই। আর আজই কী বরফ ঝড়। তুমি রাজী তো?

নেভাডা - তুমি হয়ত বুঝতে পেরেছ যে অনেক আগে থেকেই আমি রাজি। আর আমি নিজেও এই রকম ঝড় বৃষ্টির রাতের কথা ভেবেছিলাম। এই যে ফুল দিয়ে সেজে গীর্জায় গিয়ে দুপুর বেলায় বিয়ে, ওটাকে আমি চিরকালই ঘৃণা করি গিলবার্ট। এই ভাবে বিয়ের প্রস্তাব করার মত মনের জোর যে তোমার আছে সেটা আমি ভাবতেও পারিনি। ওদের অবাক করে দেব - এটা আমাদের শোকযাত্রা, তাই না?

- কী আশ্চর্য! কথাটা কোথায় যেন শুনেছি। এক মিনিট অপেক্ষা কর। একটা ফোন কারে আসি।

ছোট ড্রেসিং রুমে ঢুকে ফোন করল গিলবার্ট।

-কে? জ্যাক? আরে ঘুম কাতুরে! হ্যা উঠে পড়, আমি বলছি- হ্যা আমি। এখনই আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি। হ্যা, তোমার বোনকেও ঘুম থেকে তোল, আমাকে আর কিছু জানাতে হবে না, ওকেও সঙ্গে নিয়ে এস। হ্যা অবশ্যই। হ্যা নেভাডা এখানেই আছে। বেশ কিছুদিন আগে আমাদের বিয়ের কথা পাকা হয়ে আছে। Agnes কে আনা চাই-ই। আনবে? কী ভাল ছেলে।

গিলবার্ট নেভাডার কাছে এসে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল, আমার পুরনো বন্ধু জ্যাক পেটন (Jack Peyton) ও তার বোন অ্যাগ্নেস এখানে আসছে পৌনে বারটার সময়, কিন্তু জ্যাক সবসময় বেশ দেরী করে। এইমাত্র তাদের আসতে বললাম। এখুনি এসে যাবে। আজ আমি পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষ নেভাডা। আজ তোমাকে যে চিঠিটা লিখেছি সেটা কোথায়?

নেভাডা চিঠিটা বের করে বলল --এখানেই রেখে দিয়েছি।

চিঠিটা ভালভাবে পড়ে চিন্তিতমুখে তাকাল নেভাডার দিকে --মাঝ রাতে স্টুডিয়োত আসতে ডাকায় খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলে না?

চোখ ঘুরিয়ে তাকাল নেভাডা - না। কেন? মোটেই না, যত রাতই হোক আর যত ঝড় জলই হোক, তবু না।

গিলবার্ট পাশের ঘর থেকে একগাদা ওভারকোট এনে বলল এটা এখুনি পড়ে নাও, সিকি মাইল পথ যেতে হবে। জ্যাক ও তার বোন দুমিনিটেই এসে যাবে। নিজেও ওভারকোটটা গায়ে দিতে দিতে বলল ---ওঃ নেভাডা টেবিলের ওপর আজকের সান্ধ্য কাগজটা আছে। ওটার শিরোনামগুলোতে চোখ বুলিয়ে নাও তো পশ্চিম অঞ্চলের খবর আছে। আমি জানি তোমার ভাল লাগবে।

গায়ে দিতে দেরী হচ্ছে, এমন ভান করে এক মিনিট অপেক্ষা করে ঘুরে দাঁড়াল গিলবার্ট

নেভাডা নড়েনি, বিস্মিত, বিষয় মুখে দাড়িয়ে আছে। গালের রঙ বদলে গেল, চোখ দুটো স্থির। বলল - আমি তোমাকে বলতে যাচ্ছিলাম যেভাবে হোক, আগে তুমি - আগে আমরা - মানে সব কিছুর আগে বাবা আমাকে একদিনের জন্যও স্কুলে পাঠায়নি, আমি নিরক্ষর। আমি জীবনে কখনো একটি শব্দও শিখিনি। এখন যদি ---

কানে এল জ্যাক ও অ্যাগ্নেসের পায়ের শব্দ।

 

মিঃ ও মিসেস গিলবার্ট (নেভাডা) যখন অনুষ্ঠানের শেষে গাড়িতে (closed carriage) করে ফিরছিল তখন গিলবার্ট বলল -- নেভাডা, তুমি কি সত্যিই জানতে চাও, সেদিন রাতে যে চিঠিটা তোমাকে পাঠিয়েছিলাম তাতে কি লিখেছিলাম?  

-- এসব ছাড়।

ঠিক এই কথাগুলি লিখেছিলাম, প্রিয় মিস ওয়ারেন, ফুলের ব্যাপারে তোমার কথাই ঠিক। ফুলটি ছিল হাইড্রেঞ্জির (hydrangea), লাইলাক (lilac) নয়।  

নেভাডা ডাকল - ঠিক আছে। কিন্তু এটি ভুলে যাওয়াই ভাল। আসলে ঠাট্টা তো বারবারাকে নিয়েই করা হয়েছিল।

- - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - - -  

রাসুল (সাঃ) বলেন 'রমণী হল আওরাত; সুতরাং যখন সে (বাড়ি হতে) বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে রমণীয় করে দেখায়।’ ‘কোন পুরুষ একজন মহিলার সাথে নির্জনে মিলিত হলে তাদের তৃতীয় সঙ্গী হয় শয়তান (তিরমিজি)

No comments:

Post a Comment

Featured Post

সুইসাইড – থ্রিলার গল্প - রবিন জামান খান – Suiside - Thiller story Bangla

  Thiller story Bangla,থ্রিলার গল্প, সুইসাইড সুইসাইড – থ্রিলার গল্প - রবিন জামান খান – Suiside - Thiller story Bangla দৌড়াতে দৌড়াতে মি...